Annapurna Basu: From Behind the Scenes to Her Own Creative World

Annapurna Basu Indian Bengali director and filmmaker
অন্নপূর্ণা বসু: সহকারী পরিচালক থেকে নিজস্ব সিনেমার নির্মাতা

ভারতীয় বাংলা সিনেমার জগতে অন্নপূর্ণা বসু এমন একজন নির্মাতা, যাঁর চলচ্চিত্র-যাত্রা হঠাৎ করে পরিচালকের আসনে বসে শুরু হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি নিজের পরিচালনার ভাষা নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের বাংলা সিনেমা ‘স্বার্থপর’ তাঁকে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে নতুন পরিচিতি এনে দেয়।

চলচ্চিত্রে অন্নপূর্ণা বসুর পথচলা

অন্নপূর্ণা বসু কলকাতাভিত্তিক চলচ্চিত্রকর্মী এবং পরিচালক। তাঁর পেশাগত যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দীর্ঘদিন তিনি পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি অন্নপূর্ণা বসুর কাজের পরিধি শুধু পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ক্রেডিটে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে লেখালেখি, সম্পাদনা ও অন্যান্য নির্মাণ-সংক্রান্ত কাজের উপস্থিতিও পাওয়া যায়।

‘বাইশে শ্রাবণ’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা

অন্নপূর্ণা বসুর ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি হলো সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত ২০১১ সালের জনপ্রিয় বাংলা ক্রাইম-থ্রিলার ‘বাইশে শ্রাবণ’। ছবিটির লেখকদের মধ্যে তাঁর নাম রয়েছে এবং IMDb-তেও তাঁকে ছবিটির সাবটাইটেল লেখক হিসেবে ক্রেডিট দেওয়া হয়েছে।

‘বাইশে শ্রাবণ’-এর গল্পে কলকাতায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং বাংলা কবিতার সঙ্গে হত্যার যোগসূত্রকে কেন্দ্র করে একটি রহস্যময় তদন্তের কাহিনি তুলে ধরা হয়। ছবিটিতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, আবির চট্টোপাধ্যায়সহ একাধিক পরিচিত অভিনেতা অভিনয় করেন।

এ ছাড়া ২০১৩ সালের ‘মিশর রহস্য’ ছবির ক্রেডিটেও অন্নপূর্ণা বসুর নাম পাওয়া যায়। সেখানে তাঁর কাজের ধরন ছিল সাবটাইটেল-সংক্রান্ত।

‘শশীভূষণ’ ও পরিচালনায় প্রথমদিকের কাজ

পরিচালক হিসেবে অন্নপূর্ণা বসুর প্রাথমিক কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১৭ সালের বাংলা স্বল্পদৈর্ঘ্য থ্রিলার ‘শশীভূষণ’ (Shoshibhushon)। ছবিটির পরিচালক ও লেখক—দুই ভূমিকাতেই ছিলেন অন্নপূর্ণা বসু। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।

এরপর ২০১৯ সালে তিনি পরিচালনা করেন ‘Saat No. Shanatan Sanyal’। এটি একটি বাংলা থ্রিলার এবং ছবিটিতে সাহেব ভট্টাচার্য, বিভাস চক্রবর্তী, শাওলি চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও দেবদূত ঘোষসহ বেশ কয়েকজন অভিনেতা অভিনয় করেন।

অর্থাৎ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে বড় পরিসরে কাজ করার আগেই স্বল্পদৈর্ঘ্য ও থ্রিলারধর্মী নির্মাণের মাধ্যমে অন্নপূর্ণা বসু নিজের পরিচালনার অভিজ্ঞতা তৈরি করে নিয়েছিলেন।

‘স্বার্থপর’ দিয়ে বড় পরিসরে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ

অন্নপূর্ণা বসুর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ‘স্বার্থপর’ ছবির মাধ্যমে। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই বাংলা ড্রামাটি তাঁর স্বাধীন পরিচালক হিসেবে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবিটি প্রযোজনা করেছে সুরিন্দর ফিল্মস।

ছবিটির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ভাই-বোন অপর্ণা ও সৌরভের সম্পর্ক। একসময় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই দুই ভাই-বোনের জীবনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের প্রভাব পড়ে। সেই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে পারিবারিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, অভিমান ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে।

ছবিতে অপর্ণা চরিত্রে অভিনয় করেন কোয়েল মল্লিক, আর সৌরভের চরিত্রে দেখা যায় কৌশিক সেনকে। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন রঞ্জিত মল্লিক, অনির্বাণ চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেন জিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এবং চিত্রগ্রহণ করেন অনুপ সিং।

‘স্বার্থপর’ ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর ভারতে মুক্তি পায় এবং এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৫ মিনিট। ভারতের চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের তথ্যেও অন্নপূর্ণা বসুকে ছবিটির পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোয়েল মল্লিককে পরিচালনার অভিজ্ঞতা

‘স্বার্থপর’-এর মাধ্যমে অন্নপূর্ণা বসু প্রথমবারের মতো কোয়েল মল্লিকের মতো প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীকে পরিচালক হিসেবে পরিচালনা করার সুযোগ পান। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি কোয়েলকে পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন।

অন্নপূর্ণার বক্তব্য অনুযায়ী, কোয়েল মল্লিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে ছবির চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও সাহায্য করেছে। বিশেষ করে একজন তারকা অভিনেত্রীকে কীভাবে গল্পের চরিত্রের ভেতরে নিয়ে আসা যায়, সেটি তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল।

অন্নপূর্ণা বসুর নির্মাণভঙ্গি

অন্নপূর্ণা বসুর কাজের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষের সম্পর্ক এবং তার ভেতরের দ্বন্দ্ব তাঁর গল্প বলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

‘শশীভূষণ’-এ তিনি থ্রিলারের মাধ্যমে একজন মানুষের নিয়ন্ত্রিত জীবনে হঠাৎ তৈরি হওয়া অস্থিরতা তুলে ধরেছেন। ‘Saat No. Shanatan Sanyal’-এও থ্রিলারধর্মী গল্পের মাধ্যমে কাজ করেছেন। অন্যদিকে ‘স্বার্থপর’-এ তিনি পারিবারিক সম্পর্ক ও মানুষের মানসিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গল্প বলেছেন।

দীর্ঘদিন সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার ফলে চলচ্চিত্রের সেট, অভিনেতা পরিচালনা এবং নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতারই পরিণত রূপ হিসেবে ‘স্বার্থপর’-এর মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তাঁর নিজস্ব পরিচালনার যাত্রা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যতের পথে অন্নপূর্ণা বসু

অন্নপূর্ণা বসুর ক্যারিয়ার এখনো তুলনামূলকভাবে নতুন পর্যায়ে রয়েছে। তবে পরিচালনার আগে দীর্ঘ সময় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করা, বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রে নির্মাণ-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে স্বল্পদৈর্ঘ্য ও পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর ক্যারিয়ারকে একটি আলাদা ভিত্তি দিয়েছে।

‘স্বার্থপর’ দিয়ে বড় পরিসরে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর বাংলা চলচ্চিত্রে অন্নপূর্ণা বসুর পরবর্তী কাজের দিকে দর্শকদের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে তিনি সম্পর্কভিত্তিক গল্পের পাশাপাশি আরও ভিন্ন ঘরানায় নিজের নির্মাণশৈলী কতটা বিস্তৃত করেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সব মিলিয়ে, অন্নপূর্ণা বসুর গল্পটি একজন চলচ্চিত্রকর্মীর ধীরে ধীরে নির্মাতায় পরিণত হওয়ার গল্প—সহকারী পরিচালক হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে নিজের পরিচালনায় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ পর্যন্ত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ