লাবণী সরকার: বাংলা অভিনয় জগতের শক্তিশালী চরিত্রাভিনেত্রীর গল্প
বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে এমন কিছু অভিনেত্রী আছেন, যাঁদের উপস্থিতি পর্দায় এলেই গল্পের চরিত্রগুলো আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। লাবণী সরকার তাঁদেরই একজন। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে তিনি কখনও প্রধান চরিত্রে, কখনও মায়ের ভূমিকায়, আবার কখনও একেবারে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মনে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।
শুধু বাণিজ্যিক সিনেমা নয়, সমান্তরাল ধারার চলচ্চিত্রেও তাঁর অভিনয়ের পরিচয় পাওয়া যায়। অভিনয়ের স্বাভাবিকতা, সংলাপ বলার ধরন এবং চরিত্রের আবেগকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতার কারণে বাংলা বিনোদন জগতে তিনি একজন সম্মানিত অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত।
অভিনয়জীবনের শুরু
লাবণী সরকারের জন্ম কলকাতায়। অভিনয়ে আসার আগে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তবে শেষ পর্যন্ত অভিনয়কেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন।
আশির দশকে জোছন দস্তিদারের পরিচালনায় একটি বাংলা টেলিভিশন সিরিজের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু। টেলিভিশনে কাজ করার পর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি বড় পর্দায় আসার জন্য। অপর্ণা সেনের ‘সতী’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
এরপর ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর কাজের পরিধি বাড়তে থাকে।
চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি
লাবণী সরকারের অভিনয়জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো—তিনি নিজেকে কোনো একটি ধরনের চরিত্রের মধ্যে আটকে রাখেননি। কখনও কেন্দ্রীয় চরিত্র, কখনও পার্শ্বচরিত্র, আবার কখনও একজন মায়ের ভূমিকায় তাঁকে দেখা গেছে।
‘চরাচর’, ‘হুইল চেয়ার’, ‘কাঁচের পৃথিবী’, ‘উজান’, ‘নৌকাডুবি’, ‘মাটি’, **‘আমাজন অভিযান’**সহ বহু সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছে।
বিশেষ করে তপন সিংহের ‘হুইল চেয়ার’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। অন্যদিকে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘চরাচর’-এ অভিনয়ের জন্যও তিনি বিশেষ স্বীকৃতি পান। এই সিনেমাগুলো প্রমাণ করে, চরিত্র ছোট না বড়—লাবণী সরকার অভিনয়ের মাধ্যমে সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
লাবণী সরকারের অভিনয় শুধু দর্শকের প্রশংসাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিভিন্ন পুরস্কারেও তাঁর দক্ষতার স্বীকৃতি মিলেছে।
তিনি Bengal Film Journalists' Association Awards (BFJA)-এ টানা তিন বছরে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালে ‘কাঁচের পৃথিবী’, ১৯৯৫ সালে ‘হুইল চেয়ার’ এবং ১৯৯৬ সালে ‘চরাচর’-এর জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।
এছাড়াও তিনি Kalakar Awards এবং West Bengal Tele Academy Awards-সহ বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ২০২২ সালে টেলিভিশনে সহ-অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য West Bengal Tele Academy Award-ও তাঁর ঝুলিতে আসে।
চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে নতুন পরিচয়
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে লাবণী সরকারকে মূল চরিত্রেও দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে তিনি চরিত্রাভিনয়ের দিকে বেশি মনোযোগ দেন। বিশেষ করে মা, পরিবারের অভিভাবক কিংবা গল্পের গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে।
তবে ‘চরিত্রাভিনেত্রী’ শব্দটি তাঁর অভিনয়ের পরিসরকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না। কারণ ছোট পরিসরের চরিত্রেও তিনি এমনভাবে অভিনয় করেন যে অনেক সময় সেই চরিত্রই দর্শকের মনে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নেয়। ২০২৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি কাজের ধরন বা মাধ্যমের চেয়ে কাজটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং চলচ্চিত্র, টেলিভিশন কিংবা মঞ্চ—কোন মাধ্যমে কাজ করছেন, সেটিকে কখনও প্রধান বিষয় হিসেবে দেখেননি।
জনপ্রিয় সিনেমায় লাবণী সরকার
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে লাবণী সরকার বাংলা সিনেমার বহু পরিচিত অভিনেতা ও পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। ‘নৌকাডুবি’, ‘আমাজন অভিযান’, ‘চ্যাম্প’, ‘মাটি’, ‘অতি উত্তম’, **‘মিসেস আন্ডারকভার’**সহ বিভিন্ন সিনেমায় তাঁকে দেখা গেছে।
তাঁর অভিনয়ের আরেকটি বিশেষ দিক হলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রের ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেও দর্শকের কাছে তাঁর উপস্থিতি পুরোনো হয়ে যায়নি।
ব্যক্তিগত জীবন
লাবণী সরকার অভিনেতা কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের একটি ছেলে রয়েছে। কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত অভিনেতা এবং দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু সিনেমায় কাজ করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি অভিনয়কেই তিনি তাঁর পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে ধরে রেখেছেন।
এখনও অভিনয়ে সক্রিয়
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করার পরও লাবণী সরকার থেমে নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও তাঁকে বাংলা সিনেমা ও বিভিন্ন পর্দার কাজে দেখা যাচ্ছে। ‘রুদ্রা’, ‘ঝুমুর’, ‘হাঙ্গামা ডট কম’ এবং ‘কীর্তনের পর কীর্তন’-এর মতো সাম্প্রতিক কাজেও তাঁর উপস্থিতি রয়েছে।
২০২৬ সালেও তাঁকে নতুন কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও অতিরিক্ত গ্ল্যামারাস সাজসজ্জা পছন্দ না করার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
বাংলা অভিনয়ে লাবণী সরকারের অবস্থান
লাবণী সরকারের ক্যারিয়ারকে শুধু সিনেমার সংখ্যায় বিচার করলে তাঁর আসল অবদান পুরোপুরি বোঝা যাবে না। কয়েক দশক ধরে তিনি এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেগুলো গল্পের আবেগ ও বাস্তবতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
নায়িকা হিসেবে শুরু করে ধীরে ধীরে শক্তিশালী চরিত্রাভিনেত্রী হয়ে ওঠা এবং একই সঙ্গে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে নিজের জায়গা ধরে রাখা—এই দীর্ঘ যাত্রাই লাবণী সরকারের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
বাংলা বিনোদন জগতে অনেক অভিনেত্রী এসেছেন, অনেকেই জনপ্রিয় হয়েছেন এবং সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু লাবণী সরকার তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রম। অভিনয়ের প্রতি দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, চরিত্রের প্রতি যত্ন এবং স্বাভাবিক অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বাংলা দর্শকের কাছে এমন একটি পরিচয় তৈরি করেছেন, যা সময়ের সঙ্গে আরও শক্ত হয়েছে।


0 মন্তব্যসমূহ