মমিতা বাইজু: মালয়ালম সিনেমার নতুন প্রজন্মের পরিচিত মুখ
মালয়ালম সিনেমায় গত কয়েক বছরে যে তরুণ অভিনেত্রীরা দর্শকদের নজর কেড়েছেন, তাঁদের মধ্যে মমিতা বাইজু অন্যতম। স্বাভাবিক অভিনয়, প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে Premalu সিনেমায় রীণু চরিত্রে অভিনয়ের পর মমিতার জনপ্রিয়তা মালয়ালম সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের অন্য দর্শকদের কাছেও পৌঁছে যায়।
তবে মমিতা বাইজুর অভিনয়জীবনের শুরু Premalu দিয়ে নয়। ছোট চরিত্র থেকে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে এসে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি মডেলিং ও ক্লাসিক্যাল নৃত্যের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় রয়েছে।
জন্ম ও শৈশব
মমিতা বাইজুর জন্ম ২০০১ সালের ২২ জুন ভারতের কেরালা রাজ্যের কোট্টায়াম জেলার কিডাঙ্গুরে। তাঁর পুরো নাম মমিতা বাইজু কৃষ্ণন। তাঁর বাবা ডা. বাইজু কৃষ্ণন একজন চিকিৎসক এবং মা মিনির সঙ্গে তাঁর পারিবারিক জীবন কেরালাতেই কেটেছে। তাঁর মিথুন নামে একজন বড় ভাইও রয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। ক্লাসিক্যাল নৃত্যের চর্চাও করেছেন তিনি। নাচের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁর পরিচিতি তৈরি হতে থাকে।
পড়াশোনা
মমিতা কেরালার কাচ্চিরার Mary Mount Public School এবং পরে N.S.S. Higher Secondary School, Kidangoor-এ পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি কোচির Sacred Heart College-এ মনোবিজ্ঞানে বি.এসসি পড়াশোনা শুরু করেন। তবে তৃতীয় বর্ষে উপস্থিতির সমস্যার কারণে তাঁর পড়াশোনা আর শেষ করা হয়নি বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
অভিনয়ের পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহও ছিল। তবে সিনেমায় কাজের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ই তাঁর পেশাগত জীবনের প্রধান অংশ হয়ে ওঠে।
সিনেমায় অভিষেক
মমিতা বাইজুর বড় পর্দায় অভিষেক হয় ২০১৭ সালের মালয়ালম সিনেমা Sarvopari Palakkaran দিয়ে। তখন তিনি এখনও পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিনেমাটিতে তাঁর ভূমিকা খুব বড় ছিল না, কিন্তু সেই কাজের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে তাঁর পথচলা শুরু হয়।
অভিষেকের পর কয়েক বছর তাঁকে বিভিন্ন সিনেমায় ছোট ও পার্শ্ব চরিত্রে দেখা যায়। ধীরে ধীরে তাঁর অভিনয়ের পরিসর বাড়তে থাকে এবং দর্শকরাও তাঁকে আলাদা করে চিনতে শুরু করেন।
‘Operation Java’ ও ‘Kho Kho’
মমিতার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ সময় আসে ২০২১ সালে। ওই বছর তিনি Operation Java এবং Kho Kho-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন।
Operation Java-তে আলফোন্সা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের নজরে আসেন। এরপর Kho Kho সিনেমায় তাঁর অভিনয়ও প্রশংসা পায়। এই সময় থেকেই মমিতাকে শুধু নতুন মুখ হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী হিসেবেও দেখা শুরু হয়।
বিশেষ করে Kho Kho-এর অভিনয়ের জন্য তিনি Kerala Film Critics Award-এ সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার পান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘Super Sharanya’-তে জনপ্রিয়তা
২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া Super Sharanya মমিতা বাইজুর ক্যারিয়ারে আরও একটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা। এতে তিনি সোনা নামের একটি প্রাণবন্ত ও মজার চরিত্রে অভিনয় করেন।
চরিত্রটির সহজ-স্বাভাবিক উপস্থাপন দর্শকদের ভালো লাগে। মমিতার অভিনয়ে কমেডি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। সিনেমাটি তাঁকে তরুণ দর্শকদের মধ্যে আরও পরিচিত করে তোলে।
এরপর Pranaya Vilasam-এ গোপিকা চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ২০২৩ সালের এই সিনেমায় অর্জুন অশোকনের সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকদের মধ্যে বেশ পরিচিতি পায়। একই সময় Ramachandra Boss & Co.-তেও অভিনয় করেন মমিতা।
‘Premalu’ বদলে দেয় ক্যারিয়ারের গতি
মমিতা বাইজুর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচিতি আসে ২০২৪ সালের Premalu সিনেমার মাধ্যমে। গিরীশ এ. ডি. পরিচালিত এই রোমান্টিক কমেডি সিনেমায় তাঁর সঙ্গে প্রধান চরিত্রে ছিলেন নাসলেন কে. গাফুর।
সিনেমাটিতে মমিতা রীণু রয় চরিত্রে অভিনয় করেন। হায়দরাবাদে কাজ করা একজন তরুণীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল প্রাণবন্ত এবং স্বাভাবিক। সিনেমাটির গল্প, সংলাপ, নাসলেন-মমিতার রসায়ন এবং চরিত্রগুলোর উপস্থাপন দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে।
Premalu মুক্তির পর মমিতা শুধু মালয়ালম সিনেমার দর্শকদের কাছেই নয়, অন্যান্য ভাষার দর্শকদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। সিনেমাটি মালয়ালম চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্যে পরিণত হয় এবং মমিতার ক্যারিয়ারেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে।
তামিল সিনেমায় অভিষেক
মালয়ালম সিনেমায় পরিচিতি পাওয়ার পর মমিতা তামিল চলচ্চিত্রেও পা রাখেন। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া Rebel ছিল তাঁর তামিল সিনেমায় অভিষেক। সিনেমাটিতে তিনি সারা মেরি জন চরিত্রে অভিনয় করেন।
একটি ভাষার চলচ্চিত্রে পরিচিতি পাওয়ার পর অন্য ভাষার সিনেমায় কাজ করার সুযোগ মমিতার ক্যারিয়ারের পরিধি আরও বাড়িয়ে দেয়।
পরবর্তী সিনেমা
Premalu-এর সাফল্যের পর মমিতা বাইজুর হাতে একাধিক নতুন কাজ আসে। ২০২৫ সালে তাঁকে Dude সিনেমায় দেখা যায়, যেখানে তিনি কুরাল চরিত্রে অভিনয় করেন। একই সময়ে তামিল চলচ্চিত্র VKD (Very Kruel Devil)-এর সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত হয়।
২০২৬ সালেও তাঁর বেশ কয়েকটি কাজের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে Bethlehem Kudumba Unit, Kara এবং Irandu Vaanam উল্লেখযোগ্য। Vishwanath & Sons সিনেমাতেও তিনি অভিনয় করেছেন।
মমিতা বাইজুর অভিনয়ের ধরন
মমিতার অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চরিত্রকে খুব বেশি কৃত্রিমভাবে উপস্থাপন না করে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা। তাঁর অভিনয়ে অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার ধরন এবং হাস্যরসাত্মক দৃশ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা সহজেই চোখে পড়ে।
Super Sharanya কিংবা Premalu-এর মতো সিনেমায় তাঁর প্রাণবন্ত অভিনয় যেমন দর্শকদের আকর্ষণ করেছে, তেমনি Operation Java ও Kho Kho-এর মতো সিনেমায় তিনি ভিন্ন ধরনের চরিত্রেও কাজ করেছেন। ফলে অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে তাঁর অভিনয়ের পরিধিতে বৈচিত্র্য দেখা যায়।
উল্লেখযোগ্য সিনেমা
মমিতা বাইজুর অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
Sarvopari Palakkaran
Honey Bee 2: Celebrations
Dakini
Krishnam
Varathan
School Diary
An International Local Story
Vikruthi
Operation Java
Kho Kho
Randu
Super Sharanya
Pranaya Vilasam
Ramachandra Boss & Co.
Premalu
Rebel
Dude
VKD (Very Kruel Devil)
Bethlehem Kudumba Unit
Kara
Vishwanath & Sons
তাঁর ক্যারিয়ারে আরও কিছু সিনেমা রয়েছে এবং নতুন কাজের মাধ্যমে তিনি মালয়ালম ও তামিল—দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই নিজের জায়গা আরও বিস্তৃত করছেন।
ব্যক্তিগত জীবন
মমিতা বাইজু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সাধারণত খুব বেশি আলোচনায় আনেন না। তাঁর পরিবারে বাবা ডা. বাইজু কৃষ্ণন, মা মিনি এবং বড় ভাই মিথুন রয়েছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর নাচের প্রতি আগ্রহও দীর্ঘদিনের।
মমিতা বাইজুর ক্যারিয়ার এক নজরে
খুব অল্প বয়সে Sarvopari Palakkaran দিয়ে সিনেমায় পা রাখার পর মমিতা বাইজু ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। Operation Java ও Kho Kho তাঁকে পরিচিতি দেয়, Super Sharanya তাঁকে তরুণ দর্শকদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে এবং Pranaya Vilasam ও অন্যান্য সিনেমার মাধ্যমে তাঁর অভিনয়ের পরিধি বাড়তে থাকে।
তবে Premalu তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে। রীণু চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয় এবং এরপর তামিল সিনেমাতেও কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।
একজন তরুণ অভিনেত্রী হিসেবে মমিতা বাইজুর পথচলা এখনও দীর্ঘ। মালয়ালম সিনেমার পাশাপাশি তামিল চলচ্চিত্রেও কাজ করার মাধ্যমে তিনি নিজের ক্যারিয়ারকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সামনে তাঁর নতুন চরিত্রগুলোতে দর্শক তাঁকে কীভাবে দেখতে পান, সেটিই এখন তাঁর ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায়ের আকর্ষণীয় দিক।

