ধ্রুব ব্যানার্জি: বাঙালির নস্টালজিয়া ও আধুনিক সিনেমার এক সফল মেলবন্ধন

এক সময় পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিটি বাজিয়ে সিনেমা দেখার যে ট্রেডিশনাল আনন্দ ছিল, মাঝখানে তা অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছিল। কিন্তু সেই হারানো দিনগুলোকে আধুনিক মোড়কে বড় পর্দায় আবার ফিরিয়ে এনেছেন যিনি, তিনি পরিচালক ধ্রুব ব্যানার্জি

বাঙালির রক্তে যেমন রোমাঞ্চ ও রহস্যের প্রতি ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তেমনই আছে নিজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার এক সুপ্ত ইচ্ছা। ধ্রুব ব্যানার্জি ঠিক এই জায়গাটাকেই চিনেছেন এবং একের পর এক মাস্টারপিস উপহার দিয়ে যাচ্ছেন।

১. ইতিহাস কোনো শুষ্ক বিষয় নয়, এক জ্যান্ত রোমাঞ্চ

পাঠ্যবইয়ের পাতায় যে ইতিহাস আমরা মুখস্থ করতাম, ধ্রুব ব্যানার্জি প্রমাণ করেছেন সেই ইতিহাসকেই যদি সঠিক গল্পের ছাঁচে ফেলা যায়, তবে তা যেকোনো ফ্যান্টাসি ফিল্মকেও টেক্কা দিতে পারে।

  • গুপ্তধনের ফ্র্যাঞ্চাইজি: ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ বা ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’-এ শুধু সোনার বাটি বা অলঙ্কার খোঁজা হয়নি, বরং বাংলার জমিদার বাড়ির পুজো, হারিয়ে যাওয়া দেবোত্তর সম্পত্তি আর প্রাচীন পুঁথির ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে।

  • ইতিহাসের পাঠশালা: সিনেমা হলে পপকর্ন খেতে খেতে দর্শক কিন্তু অজান্তেই বাংলার গৌরবময় অতীত সম্পর্কে জেনে বাড়ি ফিরেছেন। এই ক্রেডিটটা ধ্রুব ব্যানার্জির প্রাপ্য।

২. 'সোনাদা' ও ট্রাইঅ্যাঙ্গেল কেমিস্ট্রি

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে ফেলুদা, ব্যোমকেশ বা কাকাবাবুর প্রভাব অপার। এমন এক জায়গায় একেবারে নতুন এক চরিত্র 'সোনাদা' (প্রফেসর সুবর্ণ সেন)-কে তৈরি করে দর্শকমনে জায়গা করে দেওয়া সহজ কাজ ছিল না।

ধ্রুব ব্যানার্জি সোনাদার চরিত্রের সাথে আবীর ও ঝিনুকের যে রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা দর্শককে হালকা মেজাজের হাসির পাশাপাশি রহস্যের আসল থ্রিল দেয়। কোনো জটিল ডার্ক থিম ছাড়াই একটা সুস্থ-সুন্দর পারিবারিক সিনেমা যে হিট হতে পারে, তিনি তা বারংবার দেখিয়েছেন।

৩. লার্জার-দ্যান-লাইফ ক্যানভাস: 'গোলন্দাজ'

শুধু ছোটখাটো বাজেটেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গোলন্দাজ’ ছবিতে ধ্রুব ব্যানার্জি দেখিয়েছেন কীভাবে বড় ক্যানভাসে ছবি বানাতে হয়।

১৮০০ শতকের ব্যাকড্রপে ভারতের ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর গল্প পর্দায় ফুটিয়ে তোলা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু অসাধারণ প্রোডাকশন ডিজাইন, কাস্টিং এবং সুচারু পরিচালনার মাধ্যমে তিনি এক অন্যরকম জাতীয়তাবাদী আবেগের জন্ম দিয়েছিলেন বড় পর্দায়।

৪. কেন ধ্রুব ব্যানার্জির সিনেমা এত জনপ্রিয়?

  • বাঙালির নস্টালজিয়া: তাঁর প্রতিটি ফ্রেমেই পাওয়া যায় নিখাদ বাঙালির মাটির গন্ধ, রাজবাড়ির আভিজাত্য এবং আবহমান সংস্কৃতি।

  • ভিউজুয়াল নান্দনিকতা: কালার প্যালেট থেকে শুরু করে দুর্দান্ত ক্যামেরা ওয়ার্ক—তাঁর ছবি দর্শকনয়নকে তৃপ্তি দেয়।

  • সব বয়সের সিনেমা: শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ—পরিবারের সব প্রজন্মকে একসাথে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে আসার জাদুকরী ক্ষমতা তাঁর ছবিতে স্পষ্ট।

উপসংহার

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন বাংলা সিনেমা নতুন পথ খোঁজার চেষ্টা করছে, তখন ধ্রুব ব্যানার্জি বাণিজ্যিক সিনেমাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি শুধু একজন গল্পবলেই থেমে থাকেননি, বরং বক্স অফিসে বাংলা সিনেমার বাণিজ্যিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছেন।

ভবিষ্যতে তিনি আমাদের জন্য আরও কী কী ইতিহাস আর অ্যাডভেঞ্চারের গল্প নিয়ে হাজির হন, তা দেখার জন্যই এখন সিনেমা প্রেমী বাঙালির প্রহর গোণা!