ধ্রুব ব্যানার্জি: বাংলা সিনেমায় ইতিহাস ও রোমাঞ্চের এক সফল জাদুকর
বাংলা সিনেমার ইতিহাস ও সাহিত্যের পাতা উল্টালে রোমাঞ্চ, গোয়েন্দাগিরি আর গুপ্তধনের অভাব নেই। কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের রোমাঞ্চকে বড় পর্দায় আধুনিক সাজে ফিরিয়ে এনে দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে টেনে তোলার কৃতিত্ব যার, তিনি আর কেউ নন—পরিচালক ধ্রুব ব্যানার্জি (Dhrubo Banerjee)।
এক সময় যখন মনে হচ্ছিল বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমা কিছুটা গতি হারাচ্ছে, ঠিক তখনই এক নতুন রূপকথা নিয়ে আসেন ধ্রুব ব্যানার্জি। তিনি প্রমাণ করেছেন, ইতিহাস আর বাঙালির ঐতিহ্যকে যদি সঠিক ব্যাকগ্রাউন্ডে পরিবেশন করা যায়, তবে তা বক্স অফিসে ঝড় তুলতে পারে।
১. 'সোনাদা' ও গুপ্তধনের দুনিয়া: এক নতুন ইতিহাসের সূচনা
২০১৮ সালে ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে ধ্রুব ব্যানার্জির আত্মপ্রকাশ। প্রথম ছবিতেই তিনি উপহার দেন 'সোনাদা' (প্রফেসর সুবর্ণ সেন) চরিত্রটি, যা অভিনয় করেছিলেন আবীর চট্টোপাধ্যায়। সোনাদার সাথে আবীর আর ঝিনুকের খুনসুটি, আর সেই সাথে বাংলার আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস উন্মোচন—সব মিলিয়ে ছবিটি দর্শকমনে এক অন্যরকম ভালোবাসার জায়গা তৈরি করে নেয়।
এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি:
দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন (২০১৯): প্রথম ছবির সাফল্যের পর এটি ছিল বড় বাজেটের এক ধামাকা, যা বক্স অফিসে অভাবনীয় সাফল্য পায়।
কর্ণসুবর্ণের গুপ্তধন (২০২২): সোনাদা ফ্র্যাঞ্চাইজির এই ছবিটিও মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের কাছে দারুণ প্রশংসিত হয়।
ধ্রুব ব্যানার্জি এমন এক 'পপকর্ন অ্যাডভেঞ্চার ইউনিভার্স' তৈরি করেছেন, যা ছোট থেকে বড়—সব বয়সের মানুষ একসঙ্গে হলে বসে উপভোগ করতে পারে।
২. বড় ক্যানভাসে ইতিহাস: 'গোলন্দাজ'
শুধু গুপ্তধন বা এডভেঞ্চারেই থেমে থাকেননি ধ্রুব। ২০২১ সালে তিনি নিয়ে আসেন ভারতের ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীর বায়োপিক ‘গোলন্দাজ’। সুপারস্টার দেবকে নিয়ে তৈরি এই পিরিয়ড ড্রামাটি ছিল ক্যানভাস ও মেকিংয়ের দিক থেকে বেশ বিশাল।
পরাধীন ভারতের পটভূমিতে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি এই দেশাত্মবোধক সিনেমাটি আবারও প্রমাণ করে যে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে নিখুঁত ও জাঁকজমকপূর্ণ সিনেমা বানাতে ধ্রুব ব্যানার্জি অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত।
৩. ধ্রুব ব্যানার্জির সিনেমার বিশেষত্ব কোথায়?
কেন ধ্রুব ব্যানার্জির ছবি সাধারণ দর্শক এত পছন্দ করেন? বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু বড় কারণ চোখে পড়ে:
বাঙালিয়ানা ও শিকড়ের টান: তাঁর প্রতিটি গল্পেই বাংলার সংস্কৃতি, হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, জমিদার বাড়ির স্থাপত্য কিংবা ঐতিহ্যবাহী পুজোর আবহ খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।
পারিবারিক বিনোদন (Clean Entertainment): তাঁর ছবিতে অহেতুক গা ছমছমে দৃশ্য বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা থাকে না। পরিবার নিয়ে দেখার মতো নির্মল বিনোদন তিনি নিশ্চিত করেন।
চোখধাঁধানো ফ্রেম ও ভিজ্যুয়াল: দৃশ্যায়ন, আলো-ছায়ার খেলা এবং সাবলীল সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি ছোট বাজেটেও এমন এক দৃশ্যপট তৈরি করেন, যা দেখতে একদম আন্তর্জাতিক মানের মনে হয়।
শক্তিশালী স্ক্রিপ্ট ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর: প্রতিটা রহস্যের পেছনে নিখুঁত যুক্তি এবং গা ছমছমে আবহসঙ্গীত তাঁর সিনেমার প্রাণ।
শেষ কথা
ধ্রুব ব্যানার্জি শুধু একজন সফল পরিচালকই নন, তিনি আধুনিক টলিউডে বড় বাজেটের বাণিজ্যিক ধারার সিনেমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। বাঙালি দর্শকদের আবার হলে গিয়ে সিনেমা দেখার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
ইতিহাস, রোমাঞ্চ আর বাঙালি আবেগের ককটেল বানিয়ে তিনি যেভাবে বড় পর্দায় পরিবেশন করেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সিনেমা প্রেমী হিসেবে আমাদের একটাই প্রত্যাশা—ধ্রুব ব্যানার্জি আগামী দিনেও আমাদের এমন আরও অনেক স্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর সিনেমা উপহার দিয়ে যাবেন।

