Kajal Arefin Ome: From Small-Screen Stories to a Wider Canvas

Kajal Arefin Ome Bangladeshi director portrait
কাজল আরেফিন অমি: বাংলাদেশের জনপ্রিয় নির্মাতার গল্প ও ক্যারিয়ার

বাংলাদেশের নাটক ও ওয়েব কনটেন্টের জগতে কাজল আরেফিন অমি এখন বেশ পরিচিত একটি নাম। বিশেষ করে তরুণ দর্শকদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা অনেকটাই তৈরি হয়েছে সহজ-সরল গল্প, পরিচিত মানুষের মতো চরিত্র এবং হাস্যরসের মাধ্যমে গল্প বলার নিজস্ব ধরন দিয়ে। ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিলেও অমির নির্মাণজীবন শুধু এই একটি কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

নাটক থেকে ওয়েব সিরিজ, ওয়েব ফিল্ম—বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে ধীরে ধীরে নিজের একটি আলাদা নির্মাণশৈলী তৈরি করেছেন তিনি।

কাজল আরেফিন অমির নির্মাণজীবনের শুরু

পরিচালক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আগে কাজল আরেফিন অমি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। ২০০৯ সালে নির্মাতা ইফতেখার আহমেদ ফাহমীর সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। অমির নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাহমী তাঁকে পরিচালনার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

শুরুটা খুব বড় কোনো প্রজেক্ট দিয়ে হয়নি। ধীরে ধীরে কাজ করতে করতে পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। পরে নিজের গল্প ও নির্মাণের ধরন নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং একসময় নাট্যাঙ্গনে নিজের জায়গা করে নেন।

‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ দিয়ে বড় পরিচিতি

কাজল আরেফিন অমির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিকটি মূলত কয়েকজন তরুণের জীবন, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, হাসি-ঠাট্টা এবং দৈনন্দিন নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি।

শুরুতে এটি হয়তো সাধারণ একটি কমেডি সিরিজ হিসেবেই দর্শকের সামনে এসেছিল। কিন্তু চরিত্রগুলোর স্বাভাবিক কথাবার্তা, আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এবং পরিচিত জীবনের নানা ঘটনা দর্শকদের সঙ্গে খুব দ্রুত সংযোগ তৈরি করে।

কাবিলা, শুভ, পাশা, হাবু ভাইসহ একাধিক চরিত্র দর্শকদের কাছে আলাদা পরিচিতি পায়। আর এই চরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করে ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত নাট্যধারাবাহিক হয়ে ওঠে।

অমি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, দর্শকদের ভালোবাসার কারণেই তিনি ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর নতুন সিজন নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে দায়বদ্ধতা অনুভব করেন।

শুধু কমেডির পরিচালক নন অমি

কাজল আরেফিন অমির নাম শুনলেই অনেকের প্রথমে কমেডি নাটকের কথা মনে পড়ে। তবে তিনি নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো ঘরানার মধ্যে আটকে রাখতে চান না। ২০২২ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট একটি ঘরানায় আটকে না থেকে বিভিন্ন ধরনের গল্প নিয়ে কাজ করতে চান।

তাঁর ‘ভাইরাল গার্ল’, ‘ফিমেল’, ‘আপন’, ‘এক্স বয়ফ্রেন্ড’, ‘ট্যাটু’সহ বিভিন্ন কাজেও সেই বৈচিত্র্যের ছাপ দেখা যায়।

অমির গল্পের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো চারপাশের মানুষের জীবন থেকে গল্পের উপাদান নেওয়া। তিনি নিজেই বলেছেন, নিজের জীবন ও আশপাশের মানুষের জীবন দেখেই অনেক গল্প তৈরি করেন। বই বা সিনেমা দেখে গল্প কপি করার বদলে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকে গল্পে ব্যবহার করার কথা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন।

নাটক থেকে ওয়েব কনটেন্ট

বাংলাদেশের দর্শকদের দেখার অভ্যাস যখন ধীরে ধীরে টেলিভিশন থেকে ইউটিউব ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দিকে যাচ্ছে, তখন অমিও তাঁর কাজের পরিধি বাড়িয়েছেন।

‘ঠাণ্ডা’, ‘হোটেল রিল্যাক্স’, ‘অসময়’, ‘দুঃখিত’ এবং ‘হাউ সুইট’-এর মতো ওয়েব কনটেন্ট নির্মাণ করেছেন তিনি। এর মধ্যে ‘হোটেল রিল্যাক্স’ ছিল তাঁর ওয়েব সিরিজের উল্লেখযোগ্য কাজ। পরবর্তী সময়ে ‘অসময়’ ও ‘দুঃখিত’-এর মতো ওয়েব ফিল্মেও তিনি ভিন্ন ধরনের গল্প বলার চেষ্টা করেছেন।

বিশেষ করে ‘অসময়’-এ তিনি তাঁর পরিচিত কমেডি ধাঁচের বাইরে গিয়ে সমাজের কিছু বাস্তব বিষয়কে গল্পের মধ্যে তুলে ধরেন। গল্পটির কেন্দ্রে ছিল সামাজিক অবস্থান, মানুষের দম্ভ এবং সম্পর্কের নানা দিক।

‘অসময়’ ও নতুন ধরনের গল্প

‘অসময়’ কাজল আরেফিন অমির নির্মাণজীবনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের উদাহরণ। কারণ এখানে শুধুমাত্র হাসির ওপর নির্ভর না করে সামাজিক বাস্তবতা, সম্পর্ক এবং মানুষের আচরণের বিভিন্ন দিককে গল্পের অংশ করা হয়েছিল।

এই কাজের মাধ্যমে অমি দেখানোর চেষ্টা করেন যে তাঁর নির্মাণ শুধু কমেডি গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর ওয়েব কনটেন্টেও গল্প বলার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বড় পরিসর দেখা যায়।

‘হাউ সুইট’ ও ওয়েব ফিল্ম

২০২৫ সালে অমির পরিচালনায় ‘হাউ সুইট’ মুক্তি পায়। এতে অভিনয় করেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, তাসনিয়া ফারিণসহ আরও অনেকে। ওয়েব ফিল্মটির মাধ্যমে তিনি আবারও ওয়েবভিত্তিক গল্প বলার দিকে মনোযোগ দেন।

ওয়েব কনটেন্টে কাজ করতে গিয়ে অমি নিজেও তাঁর নির্মাণের ধরনে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের কথা বলেছেন। ২০২৫ সালে ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ সিজন ৫-এর ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি জানান, আগের ওয়েবভিত্তিক কাজগুলো তাঁকে এক ধরনের সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা দিয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা নতুন সিজনের নির্মাণেও কাজে লাগাতে চেয়েছেন।

‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ সিজন ৫

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালে ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ আবার নতুন সিজন নিয়ে ফিরে আসে। সিজন ৪-এর শেষ পর্ব প্রচারের প্রায় ২৬ মাস পর সিজন ৫ নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হন অমি ও তাঁর দল।

সিজন ৫ নিয়ে অমি জানিয়েছিলেন, প্রথম দিকে তিনি জানতেন না সিরিজটি ভবিষ্যতে কোথায় যাবে। সীমিত বাজেট নিয়ে শুরু করা কাজটি ধীরে ধীরে পাঁচটি সিজন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দর্শকদের চাহিদাই নতুন সিজন তৈরির অন্যতম কারণ ছিল বলে তিনি জানান।

এবারের সিজনে আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওয়েব কনটেন্টে কাজ করার অভিজ্ঞতাও যোগ হয়েছে। ফলে নির্মাণে আরও সিনেমাটিক উপস্থাপনা আনার চেষ্টা করেছেন অমি।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

কাজল আরেফিন অমির নির্মাণকাজ বিভিন্ন সময় পুরস্কার ও স্বীকৃতিও পেয়েছে। ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর জন্য তিনি সিজেএফবি অ্যাওয়ার্ডে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর ‘আপন’ কাজটির জন্যও তিনি প্রশংসা পান।

পরবর্তী সময়ে ‘অসময়’ নিয়েও তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়। ২০২৫ সালে ‘Blender's Choice–The Daily Star OTT & Digital Content Awards’-এ ‘অসময়’-এর জন্য তিনি Best Director (Film), Popular বিভাগে পুরস্কার পান।

নিজের কাজ নিয়ে অমির ভাবনা

কাজল আরেফিন অমির কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি সংখ্যার চেয়ে কাজের মানকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বেশি কাজ করার চেয়ে কম কাজ করলেও সেটিকে ভালোভাবে করার চেষ্টা করেন।

তাঁর গল্পে সাধারণ মানুষের জীবন, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং দৈনন্দিন জীবনের হাস্যকর ঘটনাগুলো প্রায়ই জায়গা পায়। ফলে দর্শক অনেক সময় তাঁর চরিত্র বা পরিস্থিতির সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পান।

এই পরিচিত পরিবেশ এবং সহজ ভাষায় গল্প বলার ধরনই অমির কাজকে দর্শকদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

ব্যক্তিজীবনে কাজল আরেফিন অমি

কাজল আরেফিন অমি ব্যক্তিগত জীবনকে সাধারণত কাজের তুলনায় কম আলোচনায় রাখেন। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি বাবা হওয়ার খবর প্রকাশ্যে জানান। তাঁর স্ত্রী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন এবং অমি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানান।

ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি কাজের ক্ষেত্রেও তিনি বেশ ব্যস্ত ছিলেন। ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর পাশাপাশি ওয়েব ফিল্ম ও অন্যান্য নাট্যকাজ নিয়ে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।

২০২৬ সালে আবার কাজে ফেরার প্রস্তুতি

২০২৬ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছু সময় কাজ থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল অমিকে। ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর শুটিং চলাকালে গলার সমস্যার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে বিশ্রামে থাকতে হয়। পরে জুন মাসেই তিনি আবার ধীরে ধীরে নিয়মিত কাজে ফেরার কথা জানান।

তাঁর কাজে ফিরে আসার খবরটি সহকর্মী ও দর্শকদের মধ্যেও স্বস্তি তৈরি করে। কারণ ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর মতো চলমান জনপ্রিয় কাজের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।

কাজল আরেফিন অমির নির্মাণশৈলী

অমির নির্মাণশৈলীকে এক কথায় শুধু কমেডি বলা যায় না। তাঁর কাজের মধ্যে কমেডি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বাস্তব জীবনের গল্প, সম্পর্ক, সামাজিক বিষয় এবং আবেগকেও জায়গা দেন।

তাঁর নাটকের সংলাপ সাধারণত সহজ এবং কথ্য ভাষার কাছাকাছি। চরিত্রগুলোও অনেক সময় এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাদের দর্শক বাস্তব জীবনে পরিচিত মানুষ হিসেবে কল্পনা করতে পারেন।

এই কারণেই তাঁর অনেক কাজ শুধু হাসানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; গল্পের সঙ্গে দর্শকের এক ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়।

শেষ কথা

কাজল আরেফিন অমির নির্মাণজীবনের গল্প মূলত ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। সহকারী পরিচালক হিসেবে শুরু করে নাটক নির্মাণ, এরপর ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজ, আর সেখান থেকে ওয়েব সিরিজ ও ওয়েব ফিল্ম—প্রতিটি ধাপে তিনি নিজের কাজের পরিধি বাড়িয়েছেন।

‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ তাঁকে সবচেয়ে বড় পরিচিতি এনে দিলেও ‘অসময়’, ‘হোটেল রিল্যাক্স’, ‘দুঃখিত’, ‘হাউ সুইট’সহ অন্যান্য কাজ দেখিয়েছে যে অমি একই ধরনের গল্পে আটকে থাকতে চান না।

বাংলাদেশের নাটক ও ওয়েব কনটেন্টের পরিবর্তনশীল সময়ে কাজল আরেফিন অমির নির্মাণযাত্রা তাই এখনও চলমান। সামনে তিনি আরও কী ধরনের গল্প নিয়ে দর্শকদের সামনে আসেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ