সোহেল মণ্ডল: থিয়েটার থেকে ওটিটির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার গল্প
বাংলাদেশের অভিনয় জগতে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যারা হঠাৎ করে তারকা হয়ে ওঠার চেয়ে ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। সোহেল মণ্ডল তাঁদেরই একজন। থিয়েটার দিয়ে অভিনয়ের যাত্রা শুরু করে তিনি একসময় টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন।
বিশেষ করে ‘তাকদীর’ ওয়েব সিরিজে মন্টু চরিত্রে অভিনয়ের পর সোহেল মণ্ডল ব্যাপকভাবে দর্শকের নজরে আসেন। এরপর ‘বলি’, ‘উনলৌকিক’, ‘হাওয়া’, ‘মায়ার জঞ্জাল’, ‘রিফিউজি’, ‘টান’সহ বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বৈচিত্র্যময় অভিনেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
সোহেল মণ্ডলের শৈশব ও শিক্ষাজীবন
সোহেল মণ্ডলের জন্ম বগুড়ায়। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই পরবর্তীতে ঢাকায় এসে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় অবসর সময়কে কাজে লাগানোর জন্য তিনি নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক সাক্ষাৎকারে সোহেল জানিয়েছেন, নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অব ড্রামায় ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর অভিনয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
থিয়েটারে কাজ করতে গিয়ে অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। মঞ্চের নিয়মিত অনুশীলন এবং বিভিন্ন নাটকে কাজ করার অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর অভিনয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
থিয়েটার দিয়ে অভিনয়ের শুরু
সোহেল মণ্ডলের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো থিয়েটার। তিনি প্রাচ্যনাটসহ বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে কাজ করেছেন। মঞ্চে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি পথনাটকেও যুক্ত ছিলেন।
‘পিনিক’, ‘গন্ডার’, ‘মুল্লুক’, ‘রাজা এবং অন্যান্য’, ‘বন মানুষ’ ও ‘লেট মি আউট’-এর মতো মঞ্চনাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। থিয়েটারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে ক্যামেরার সামনে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার ক্ষেত্রে তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
সোহেলের নিজের কাছেও থিয়েটার গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, থিয়েটার শুধু অভিনয়ের একটি মাধ্যম নয়, বরং নিয়মিত চর্চার বিষয়। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলে মঞ্চে কাজ করার আগ্রহ তাঁর রয়েছে।
টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে প্রবেশ
থিয়েটারে কাজ করার সময়ই সোহেল মণ্ডলের সামনে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ আসতে থাকে। ২০১২ সালে একটি বিজ্ঞাপনে কাজ করার মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় তাঁর পথচলা আরও এগিয়ে যায়। এরপর রুবাইয়াত হোসাইনের ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান। সিনেমাটির জন্য অডিশন দেওয়ার পর নির্বাচিত হলেও বড় পর্দায় নিজের জায়গা তৈরি করতে তাঁকে বেশ কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
এরপর তিনি ‘মুসাফির’, ‘আয়নাবাজি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও ভিজ্যুয়াল প্রজেক্টে কাজ করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি একটা সময় সম্পাদনার কাজও করেছেন সোহেল। বিজ্ঞাপন, নাটক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সম্পাদনার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। ‘ঢাকা মেট্রো’ এবং ‘ইতি তোমারই ঢাকা’র একটি অংশের সম্পাদনার কাজের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে এক সাক্ষাৎকারে জানান।
‘তাকদীর’ দিয়ে বড় পরিচিতি
সোহেল মণ্ডলের ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে ‘তাকদীর’ ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে। সৈয়দ আহমেদ শাওকীর পরিচালনায় হইচইয়ের এই সিরিজে তিনি মন্টু চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং অনেকের কাছে সোহেল মণ্ডলের পরিচয় হয়ে যায় ‘মন্টু’ বা ‘ভাইসা’ নামে।
‘তাকদীর’-এর পর তাঁর কাছে দর্শকের প্রত্যাশাও বাড়তে থাকে। নিজের অভিনয় নিয়ে সোহেল অবশ্য খুব বেশি আত্মতুষ্টিতে ভোগেন না। বরং তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নিজের কাজকে আরও ভালো করার জায়গা সবসময় থাকে এবং তিনি ধীরে ধীরে নিজের ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে চান।
‘তাকদীর’-এ তাঁর অভিনয় ২০২১ সালের Blender’s Choice–The Daily Star OTT & Digital Content Awards-এ শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে পুরস্কৃত হয়।
‘বলি’, ‘উনলৌকিক’ ও ‘হাওয়া’
‘তাকদীর’-এর পর সোহেল মণ্ডল একের পর এক ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পান। ‘বলি’ ওয়েব সিরিজে রুস্তম চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময় ‘উনলৌকিক’, ‘রিফিউজি’, ‘পেটকাটা ষ’ এবং ‘৯ এপ্রিল’-এর মতো ওটিটি প্রজেক্টেও তাঁকে দেখা যায়।
২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’ সিনেমাতেও সোহেল মণ্ডল অভিনয় করেন। সিনেমাটিতে তাঁর চরিত্রের নাম ছিল উরকেস। ‘হাওয়া’ বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করা চলচ্চিত্রগুলোর একটি এবং সিনেমাটির অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে সোহেলের উপস্থিতিও আলাদা করে নজরে আসে।
‘মায়ার জঞ্জাল’ ও দেশের বাইরের দর্শকের কাছে পরিচিতি
সোহেল মণ্ডলের ক্যারিয়ারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘মায়ার জঞ্জাল’। ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী পরিচালিত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার এই চলচ্চিত্রে তিনি সত্য চরিত্রে অভিনয় করেন।
সিনেমাটি বাংলাদেশ ও ভারতে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর অভিনয় নিয়ে আলোচনা হয়। ভারতের নির্মাতা ও চলচ্চিত্রাঙ্গন থেকেও তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা আসে। ‘মায়ার জঞ্জাল’-এর মাধ্যমে দেশের বাইরের দর্শকদের কাছেও সোহেল মণ্ডলের কাজ আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই সিনেমার জন্য তিনি জয় ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলা ২০২৩-এ শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে মনোনীত হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন চলচ্চিত্র-তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
‘শ্যামা কাব্য’ থেকে নতুন কাজ
সোহেল মণ্ডলের অভিনয়যাত্রা শুধু ওটিটি সিরিজে থেমে থাকেনি। ‘শ্যামা কাব্য’, ‘আন্তঃনগর’, ‘ক্যাফে ডিজায়ার’, ‘বাবা সামওয়ান'স ফলোয়িং মি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও ওয়েব ফিল্মে কাজ করেছেন তিনি।
২০২৬ সালেও তাঁর কাজের পরিধি বাড়ছে। ‘রাক্ষস’ সিনেমায় শায়ান চরিত্রে এবং ‘বনলতা সেন’-এ মহীন চরিত্রে তাঁকে দেখা গেছে। ‘আঁতকা’সহ আরও কিছু নতুন কাজেও তিনি যুক্ত হয়েছেন। সাম্প্রতিক কাজগুলোতে তাঁকে আগের পরিচিত চরিত্রের বাইরে নতুন ধরনের চরিত্রে দেখা যাচ্ছে।
সম্পাদনার কাজও করেছেন সোহেল মণ্ডল
অভিনয়ের পাশাপাশি সোহেল মণ্ডলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো ভিডিও সম্পাদনা। অভিনয়ে নিয়মিত কাজ পাওয়ার আগের সময়ে তিনি সম্পাদনার কাজ করে নিজের ক্যারিয়ার চালিয়েছেন।
বিভিন্ন বিজ্ঞাপন, নাটক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সম্পাদনা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ফলে ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনের কাজ সম্পর্কেও তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সোহেল মণ্ডলের অভিনয়ের ধরন
সোহেল মণ্ডলের অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা। তিনি শুধু নায়ক বা নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। কখনো সাধারণ মানুষ, কখনো রহস্যময় চরিত্র, আবার কখনো নেতিবাচক বা জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে ‘রাক্ষস’-এর শায়ান চরিত্র নিয়ে তিনি জানান, শুরুতে চরিত্রটির গতিপথ তাঁর কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার ছিল না। পরিচালকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার পর চরিত্রটি নিয়ে তাঁর ধারণা বদলায়। এই ধরনের প্রস্তুতি তাঁর অভিনয়ের ক্ষেত্রে চরিত্র বোঝার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
অভিনয় নিয়ে সোহেল মণ্ডলের ভাবনা
সোহেল মণ্ডলের ক্যারিয়ারের গল্পটা খুব দ্রুত সাফল্য পাওয়ার গল্প নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। একসময় কাজের সুযোগের অভাবে হতাশও হয়েছেন। এমনকি অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথাও তাঁর মনে হয়েছিল। কিন্তু সম্পাদনার কাজের পাশাপাশি অভিনয় চালিয়ে গেছেন এবং সুযোগের অপেক্ষা করেছেন।
‘তাকদীর’ জনপ্রিয় হওয়ার পরও তিনি দ্রুত তারকা হওয়ার দিকে না ছুটে নিজের কাজ নিয়ে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর কাছে একটি চরিত্র ভালোভাবে করা এবং ধাপে ধাপে নিজের অভিনয়কে উন্নত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শুরু করে ওটিটি এবং বড় পর্দা—সোহেল মণ্ডলের অভিনয়জীবন মূলত দীর্ঘদিনের চর্চা, অপেক্ষা এবং পরিশ্রমের ফল। ‘তাকদীর’-এর মন্টু চরিত্র তাঁকে সাধারণ দর্শকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিলেও তিনি নিজেকে সেই একটি চরিত্রের মধ্যে আটকে রাখেননি।
‘বলি’, ‘উনলৌকিক’, ‘হাওয়া’, ‘মায়ার জঞ্জাল’, ‘রিফিউজি’, ‘টান’, ‘শ্যামা কাব্য’, ‘রাক্ষস’সহ বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তিনি বারবার ভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। সামনে আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে তাঁকে দেখা যাবে—এমন প্রত্যাশা তাঁর দর্শকদের মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশের অভিনয় অঙ্গনে নিজের জায়গা তৈরি করা এই অভিনেতার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তাঁর ধীরস্থির পথচলা। জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটে যাওয়ার বদলে অভিনয়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাওয়ার যে মানসিকতা তিনি দেখিয়েছেন, সেটিই তাঁর ক্যারিয়ারকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

