খায়রুল বাশার: মূকাভিনয় থেকে দর্শকের প্রিয় অভিনেতা
বাংলাদেশের অভিনয় জগতে খায়রুল বাশার এমন একজন অভিনেতা, যিনি খুব বেশি প্রচার-নির্ভর না হয়েও নিজের অভিনয় দিয়ে ধীরে ধীরে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। নাটক, বিজ্ঞাপন, সিনেমা এবং ওটিটি—প্রায় সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন তিনি। স্বাভাবিক অভিনয়, সংলাপ বলার ধরন এবং চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে বর্তমান সময়ের আলোচিত তরুণ অভিনেতাদের একজন করে তুলেছে।
তবে অভিনয়ের জগতে তাঁর পথচলা শুরুটা ছিল একটু ভিন্নভাবে। সংগীতের প্রতি আগ্রহ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার পর মূকাভিনয় ও মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেখান থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়।
শৈশব ও পড়াশোনা
খায়রুল বাশারের জন্ম কিশোরগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। একসময় গায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি।
পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি, মঞ্চ পরিবেশনা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নিতেন বাশার। তখনও হয়তো অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তৈরি হয়নি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়টিই পরবর্তী জীবনে তাঁর অভিনয়ের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
মূকাভিনয় থেকে অভিনয়ে
খায়রুল বাশারের অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় মূকাভিনয়ের মাধ্যমে। ২০১১ সালে মীর লোকমানের একটি মূকাভিনয় দেখে তিনি বেশ প্রভাবিত হন। সেই পরিবেশনা তাঁর মধ্যে অভিনয়ের প্রতি নতুন ধরনের আগ্রহ তৈরি করে।
পরে মীর লোকমানের সঙ্গে মিলে তিনি Dhaka University Mime Action নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলেন। মঞ্চে দর্শকের সামনে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাকে আরও শক্তিশালী করে।
এরপর ধীরে ধীরে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও অন্যান্য অভিনয় প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ আসে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে শর্টফিল্মে অভিনয়ের মাধ্যমে পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
‘পুনরাবৃত্তি’ দিয়ে ক্যারিয়ারের মোড়
খায়রুল বাশারের ক্যারিয়ারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘পুনরাবৃত্তি’। সালেহ সোবহান অনীম পরিচালিত এই প্রযোজনাটি ২০১৭ সালে তাঁর অভিনয়জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসে।
এই কাজের মাধ্যমে তিনি আরও বেশি মানুষের নজরে আসেন এবং পরবর্তীতে পরিচিত নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। খায়রুল বাশার নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ‘পুনরাবৃত্তি’কে তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এরপর আর তাঁকে খুব বেশি পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ভালো কাজের মাধ্যমে নিজের অভিনয়ের জায়গাটা শক্ত করতে থাকেন তিনি।
সিনেমায় খায়রুল বাশার
ছোট পর্দা ও স্বল্পদৈর্ঘ্য কাজের পাশাপাশি খায়রুল বাশার সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। ‘ইতি, তোমারই ঢাকা’, ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ এবং ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’ তাঁর অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে।
‘ইতি, তোমারই ঢাকা’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছে দেওয়া উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি। অন্যদিকে ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’-এ তাঁর অভিনয়ও দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে আলোচনায় আসে।
সিনেমায় কাজ করার পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন তিনি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অভিনয়ের পরিধি বেশ বড় হয়ে যায়।
‘মহানগর’ ও ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’
খায়রুল বাশারের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে ২০২১ সালে। ওই বছর মুক্তি পাওয়া ‘মহানগর’ ও ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’ তাঁকে নতুন করে দর্শকের আলোচনায় নিয়ে আসে।
আশফাক নিপুণ পরিচালিত ‘মহানগর’ ওয়েব সিরিজে তাঁর অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে। একই সময়ে ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’তেও অভিনয় করেন তিনি। পরপর দুটি আলোচিত ওটিটি প্রজেক্টে কাজ করার ফলে খায়রুল বাশার তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এরপর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তাঁর কাজের পরিমাণও বাড়তে থাকে। ‘বোধ’, ‘শুক্লপক্ষ’, ‘নিখোঁজ’সহ বিভিন্ন প্রজেক্টে তাঁকে দেখা গেছে।
অভিনয়ের ধরন
খায়রুল বাশারের অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা। অতিরিক্ত অভিনয় না করে চরিত্রের ভেতরের আবেগকে স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তোলার দিকে তাঁর আগ্রহ বেশি।
তাঁর অভিনয়ে কখনো সাধারণ মধ্যবিত্ত তরুণের চরিত্র, কখনো প্রেমিক, আবার কখনো একটু ভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্বের চরিত্র দেখা যায়। চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা তাঁর কাজের মধ্যে বেশ স্পষ্ট।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, কোনো প্রজেক্টে কাজ করার আগে গল্প ও চরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ভালো গল্পের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথাও তিনি একাধিকবার বলেছেন।
‘সন্ধি’ ও সাম্প্রতিক কাজ
২০২৫ সালে খায়রুল বাশারকে ‘সন্ধি’ নাটকেও দেখা যায়। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি টেলিভিশন, ওটিটি এবং চলচ্চিত্র—তিন মাধ্যমেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর IMDb তালিকায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালের বেশ কয়েকটি প্রজেক্টের তথ্য রয়েছে।
২০২৬ সালে তাঁর অভিনীত ‘বনলতা সেন’ নিয়েও বেশ আলোচনা হয়েছে। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত এই কাজে খায়রুল বাশার কবি জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চরিত্রটির জন্য তাঁর চেহারার মিল এবং লুক দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
২০২৬ সালের অন্যান্য কাজের মধ্যে ‘সুতরাং’, ‘নোটবুক’, ‘ডিয়ার ফ্যামিলি’, ‘মোটশকন্যা’সহ বিভিন্ন প্রজেক্টের নাম তাঁর অভিনয়ের তালিকায় রয়েছে।
দর্শকের সঙ্গে খায়রুল বাশারের সম্পর্ক
একজন অভিনেতার জনপ্রিয়তা শুধু পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দিয়ে বোঝা যায় না, দর্শক তাঁকে চরিত্রের সঙ্গে কতটা মিলিয়ে নিতে পারছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। খায়রুল বাশারের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বেশ লক্ষণীয়।
২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ‘সামির’ চরিত্রের জন্য অনেক শিশু তাঁকে চিনতে পারে এবং তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে আগ্রহী হয়। তাঁর অভিনীত চরিত্র দর্শকদের জীবনে কতটা জায়গা করে নিয়েছে, এমন অভিজ্ঞতাগুলো সেই জনপ্রিয়তারই একটি উদাহরণ।
ব্যক্তিগত জীবন ও কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
তারকা হওয়ার পরও নিজের জীবনযাপনে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে চান না খায়রুল বাশার। ২০২৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তারকা হওয়ার পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সময়ের ক্ষেত্রে। কাজের ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে গেছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তিনি শুধু সংখ্যার পেছনে ছুটতে চান না। ভালো গল্প ও চরিত্র পেলে কাজ করার আগ্রহ তাঁর বেশি। এ কারণে তাঁর ক্যারিয়ারে নাটক বা প্রজেক্টের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
খায়রুল বাশারের অভিনয়যাত্রা
কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ে মূকাভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, তারপর শর্টফিল্ম ও নাটকে অভিনয়—খায়রুল বাশারের পথচলাটা একদিনে তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে বিভিন্ন মাধ্যমের অভিজ্ঞতা অর্জন করেই তিনি বর্তমান অবস্থানে এসেছেন।
‘পুনরাবৃত্তি’ তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করেছিল। এরপর ‘ইতি, তোমারই ঢাকা’, ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’, ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’ এবং ‘মহানগর’-এর মতো কাজ তাঁর পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে ওটিটি, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নিয়মিত কাজের মাধ্যমে নিজের অভিনয়ের পরিধি বাড়িয়ে চলেছেন তিনি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, খায়রুল বাশারের ক্যারিয়ার এখনো চলমান। ২০২৬ সালেও নতুন নতুন চলচ্চিত্র, নাটক ও অন্যান্য প্রজেক্টে তাঁকে দেখা যাচ্ছে। তাই সামনে আরও ভিন্ন ধরনের চরিত্রে এই অভিনেতাকে দর্শক দেখতে পাবেন—এমন প্রত্যাশা থাকাটাই স্বাভাবিক।

