শ্রীকান্ত ওদেলা: তেলুগু সিনেমার নতুন প্রজন্মের এক স্বতন্ত্র পরিচালক
ভারতীয় সিনেমায় এমন অনেক পরিচালক রয়েছেন, যারা ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু শ্রীকান্ত ওদেলার গল্পটা একটু আলাদা। তেলুগু সিনেমার এই তরুণ পরিচালক বড় কোনো ফিল্মি পরিবারের সন্তান নন। বরং নিজের আগ্রহ, ধৈর্য আর সিনেমার প্রতি গভীর ভালোবাসাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নিয়েছেন। আজ তিনি Dasara এবং The Paradise-এর মতো আলোচিত সিনেমার পরিচালক হিসেবে পরিচিত।
শৈশব থেকেই সিনেমার প্রতি টান
শ্রীকান্ত ওদেলার জন্ম ১৪ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে তেলেঙ্গানার গোদাভারিখানিতে। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণ ছিল। তিনি জানিয়েছেন, বাবা ও কাকাদের সঙ্গে সিনেমা হলে যেতেন এবং সেখান থেকেই ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তাঁর বাবা অবশ্য চেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাক। বাবার ইচ্ছায় তিনি B.Com পড়াশোনাও করেন। কিন্তু সিনেমার স্বপ্নটা কখনো ছেড়ে দেননি।
সিনেমায় কাজ পাওয়ার জন্য তাঁর সংগ্রামের গল্পটাও বেশ interesting। শ্রীকান্ত নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পরিচালক সুকুমারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার আগে তিনি দীর্ঘ সময় তাঁর বাড়ির সামনে অপেক্ষা করতেন। শেষ পর্যন্ত সেই অধ্যবসায়ই তাঁকে সুকুমারের টিমে নিয়ে আসে।
সুকুমারের সহকারী থেকে পরিচালক
শ্রীকান্ত ওদেলার চলচ্চিত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় পরিচালক সুকুমারের সহকারী হিসেবে। তিনি Nannaku Prematho এবং পরে Rangasthalam-এর মতো সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে Rangasthalam তাঁর জন্য ছিল শেখার বড় সুযোগ। শুটিং, দৃশ্য নির্মাণ, চরিত্রের আবহ এবং সিনেমার টেকনিক্যাল দিক—সবকিছু কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি।
তবে শুধু অন্য পরিচালকের অধীনে কাজ করেই সন্তুষ্ট থাকেননি শ্রীকান্ত। নিজের গল্প বলার ইচ্ছা থেকেই ধীরে ধীরে তিনি পরিচালনায় আসার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
Dasara দিয়েই পরিচালনায় অভিষেক
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া Dasara ছিল শ্রীকান্ত ওদেলার পরিচালনায় প্রথম সিনেমা। ছবিতে প্রধান চরিত্রে ছিলেন নানি ও কীর্তি সুরেশ। নিজের এলাকার পরিবেশ, মানুষের জীবন এবং শোনা বাস্তব ঘটনাগুলোর প্রভাব সিনেমাটির গল্পে ব্যবহার করেছিলেন শ্রীকান্ত। তিনি জানিয়েছিলেন, Dasara-র গল্পের ধারণা তাঁর মাথায় আসে অনেক আগেই এবং পরে সেটিকে সিনেমার উপযোগী করে গড়ে তোলেন।
প্রথম সিনেমাতেই তাঁর নির্মাণশৈলী দর্শকদের নজর কাড়ে। Dasara বক্স অফিসেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায় এবং শ্রীকান্ত ওদেলা ফিল্মফেয়ার ও SIIMA-তে পুরস্কার অর্জন করেন।
শুধু অ্যাকশন বা বড় পর্দার দৃশ্যের ওপর নির্ভর না করে চরিত্রের আবেগ ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে গল্পের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর নির্মাণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নানির সঙ্গে আবার The Paradise
Dasara-র পর শ্রীকান্ত ওদেলা আবারও নানির সঙ্গে জুটি বাঁধেন। তাঁদের দ্বিতীয় সিনেমা The Paradise। ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী মুক্তির জন্য নির্ধারিত এই সিনেমাটি ১৯৮০-এর দশকের সেকেন্দ্রাবাদকে পটভূমি করে তৈরি করা হয়েছে। ছবিতে নানিকে দেখা যাচ্ছে জাদাল নামের একটি চরিত্রে।
The Paradise নিয়ে শ্রীকান্ত জানিয়েছেন, গল্পটিতে বাস্তব ঘটনা, কিছু চরিত্র এবং কল্পনার মিশ্রণ রয়েছে। তাঁর নিজের শৈশবের একটি ঘটনাও সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ আবেগের জায়গাকে প্রভাবিত করেছে। ছোটবেলায় তাঁর মা মেয়ে সন্তানের আশা করেছিলেন। সেই কারণে শৈশবে তাঁকে মেয়েদের মতো পোশাক পরানো এবং চুলে বেণি করে দেওয়ার স্মৃতিও সিনেমার একটি উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে তেলেঙ্গানায় বেড়ে ওঠার সময় দেখা বিভিন্ন বাস্তব ঘটনার প্রভাব মিলিয়ে The Paradise-এর জগত তৈরি করেছেন পরিচালক। তাঁর কথায়, সিনেমাটির কেন্দ্রীয় জায়গায় রয়েছে আবেগ, মা-ছেলের সম্পর্ক এবং একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গল্প।
গল্প বলার ক্ষেত্রে নিজের পথ
শ্রীকান্ত ওদেলার সিনেমার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির একটি মজার দিক হলো—তিনি শুধু প্রচলিত সিনেমা দেখে শেখার ওপর নির্ভর করেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ইংরেজি সিনেমা তিনি খুব বেশি দেখেননি; বরং কে. বিশ্বনাথ ও মণি রত্নমের সিনেমা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দৃশ্য নির্মাণের ধরন বুঝতে চেষ্টা করেছেন।
তাঁর নির্মাণে তাই একদিকে যেমন মাটির কাছাকাছি থাকা চরিত্র ও পরিবেশ দেখা যায়, অন্যদিকে আবেগকে দৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়।
ভবিষ্যতের পথে শ্রীকান্ত
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শ্রীকান্ত ওদেলা সহকারী পরিচালক থেকে নিজের পরিচয়ে একজন পরিচালক হয়ে উঠেছেন। Dasara তাঁকে তেলুগু সিনেমায় পরিচিতি এনে দিয়েছে, আর The Paradise তাঁর নির্মাণের পরবর্তী বড় পরীক্ষা হিসেবে সামনে এসেছে।
তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি আলোচিত প্রকল্প হলো চিরঞ্জীবীর সঙ্গে পরিকল্পিত সিনেমা। ফলে বোঝাই যায়, তেলুগু চলচ্চিত্রে শ্রীকান্ত ওদেলার যাত্রা এখনো অনেকটাই শুরুর পর্যায়ে। নিজের শিকড়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং আবেগকে সিনেমার গল্পের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি সামনে কী ধরনের চলচ্চিত্র উপহার দেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
একসময় যিনি পরিচালকের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সুযোগের অপেক্ষা করতেন, তিনিই আজ নিজের সিনেমার জন্য দর্শকদের অপেক্ষা করাচ্ছেন—শ্রীকান্ত ওদেলার চলচ্চিত্রযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এটাই।

