রাপূর্ণা ভট্টাচার্য: গান থেকে অভিনয়ে, নতুন প্রজন্মের এক প্রতিভাবান শিল্পীর গল্প
বাংলা বিনোদন জগতে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে রাপূর্ণা ভট্টাচার্য এমন একটি নাম, যাঁর পরিচয়ের শুরুটা অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং গায়িকা হিসেবে। নিজের কণ্ঠ ও গানের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে করতে ধীরে ধীরে পরিচালকদের নজরে আসেন তিনি। এরপর প্লেব্যাক গানের সুযোগ এবং শেষ পর্যন্ত বড়পর্দায় অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারে যোগ করেছেন নতুন একটি অধ্যায়।
ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে সম্পর্ক
রাপূর্ণা ভট্টাচার্য খুব ছোট বয়স থেকেই গান শিখতে শুরু করেন। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই তাঁর গানের তালিম শুরু হয়েছিল। তবে কলেজে পড়ার সময় গানের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। তিনি পুনের সিম্বায়োসিস কলেজে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেই সময় নিয়মিত রেওয়াজ করা বা গান নিয়ে কাজ করার সুযোগ আগের তুলনায় কমে যায়।
তবে গান থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাননি রাপূর্ণা। তাঁর দিদির পরামর্শে তিনি ইনস্টাগ্রামে নিয়মিত গান গাওয়ার ভিডিও পোস্ট করতে শুরু করেন। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল গানের সঙ্গে যোগাযোগটা ধরে রাখা। কিন্তু সেই ভিডিওগুলোই একসময় তাঁর ক্যারিয়ারের দরজা খুলে দেয়।
সামাজিক মাধ্যম থেকেই আসে প্রথম বড় সুযোগ
রাপূর্ণার গাওয়া গান সামাজিক মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের নজরে আসতে থাকে। তাঁর ভিডিও পরিচালকদের কাছেও পৌঁছায়। ২০২৪ সালে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘টেক্কা’ ছবিতে প্লেব্যাক করার সুযোগ পান তিনি। এটিই ছিল চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম বড় কাজ। এরপর একের পর এক বাংলা ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ আসে।
‘সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই’, ‘কিলবিল সোসাইটি’, ‘ধূমকেতু’ এবং ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’-সহ একাধিক ছবির গানের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা সিনেমার গানের জগতে নতুন প্রজন্মের একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিতি তৈরি করতে শুরু করেন রাপূর্ণা।
গান থেকে অভিনয়ের পথে
রাপূর্ণার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে যখন তিনি অভিনয়ের সুযোগ পান। গান গাওয়ার সময় কয়েকজন পরিচালক তাঁর অভিব্যক্তি বা ‘এক্সপ্রেশন’ লক্ষ্য করেছিলেন। তাঁদের পরামর্শেই অভিনয়ের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি।
অভিনয়ে আসার আগে প্রশিক্ষণও নেন রাপূর্ণা। তিনি জানান, ‘কাতুকুতু বুড়ো’ ছবির জন্য অভিনয়ের প্রস্তুতিতে দামিনী বেণী বসুর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ গানের পরিচিতিকে ভরসা করে সরাসরি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার বদলে অভিনয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছেন তিনি।
‘কাতুকুতু বুড়ো’ দিয়ে বড়পর্দায় অভিষেক
২০২৬ সালে রাপূর্ণা ভট্টাচার্যের অভিনয়জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় ‘কাতুকুতু বুড়ো’ ছবির মাধ্যমে। উজান গাঙ্গুলির পরিচালিত এই ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি উজান নিজেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। রাপূর্ণার জন্য ছবিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটিই তাঁর বড়পর্দায় অভিনেত্রী হিসেবে অভিষেক।
ছবিটি ২৪ জুলাই ২০২৬ সালে ভারতে মুক্তি পায় এবং বাংলা ভাষার এই সিনেমায় রাপূর্ণার সঙ্গে অভিনয় করেছেন উজান গাঙ্গুলি, রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ বসু, চূর্ণী গাঙ্গুলি, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে।
অভিনয়ে আসার সুযোগটি অবশ্য রাপূর্ণার জন্য একেবারে পরিকল্পিত ছিল না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, যখন ছবিটির জন্য ফোন পান, তখন তিনি আসলে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য বিশেষভাবে খুঁজছিলেন না। কিন্তু তাঁর গান এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওগুলোর কারণে নির্মাতাদের কাছে তাঁর নাম আগে থেকেই পরিচিত ছিল। এরপর অডিশন ও প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে তিনি ছবিতে জায়গা করে নেন।
অভিনয় করলেও গানের জায়গাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
রাপূর্ণার কাছে অভিনয় নতুন এবং আকর্ষণীয় একটি অভিজ্ঞতা হলেও গান এখনও তাঁর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন, অভিনয়ের প্রেমে পড়ে গেলেও তাঁর জীবনে গানের গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি থাকবে। ভবিষ্যতে আবার ক্যামেরার সামনে কাজ করলে অভিনয়ের প্রশিক্ষণও চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
এখানেই রাপূর্ণার যাত্রাটা কিছুটা আলাদা। অনেক অভিনেত্রীর মতো অভিনয় দিয়ে শুরু না করে তিনি প্রথমে নিজের কণ্ঠের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছেছেন। তারপর সেই পরিচিতিই তাঁকে অভিনয়ের জগতে নিয়ে এসেছে।
উজান গাঙ্গুলির সঙ্গে কাজ
‘কাতুকুতু বুড়ো’ ছবিতে রাপূর্ণার সঙ্গে কাজ করেছেন পরিচালক-অভিনেতা উজান গাঙ্গুলি। সিনেমার কাজের সূত্রে তাঁদের বন্ধুত্বও গড়ে ওঠে। তাঁদের একসঙ্গে গানবাজনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসার পর বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন তৈরি হলেও রাপূর্ণা বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি মন্তব্য করতে চাননি। তিনি উজানকে একজন ভালো বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ব্যক্তিগত আলোচনার বাইরে তাঁদের পেশাগত সম্পর্কটাই রাপূর্ণার ক্যারিয়ারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘কাতুকুতু বুড়ো’তেই একদিকে উজানের পূর্ণদৈর্ঘ্য পরিচালনায় অভিষেক, অন্যদিকে রাপূর্ণার অভিনেত্রী হিসেবে বড়পর্দায় যাত্রা—দুজনের ক্যারিয়ারের জন্যই এটি একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
সামনে কোন পথে এগোবেন রাপূর্ণা?
রাপূর্ণা ভট্টাচার্যের ক্যারিয়ার এখনও একেবারেই শুরুর পর্যায়ে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে গান এবং অভিনয়—দুই ক্ষেত্রেই কাজ করার সুযোগ পাওয়া তাঁর যাত্রাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সামাজিক মাধ্যমে নিজের গান প্রকাশ করা থেকে শুরু করে সিনেমায় প্লেব্যাক, এরপর অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে বড়পর্দায় আত্মপ্রকাশ—প্রতিটি ধাপই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।
নিজের কথাতেই বোঝা যায়, শুধু পরিচিতি পাওয়াই তাঁর লক্ষ্য নয়; নিয়মিত কাজ করে নিজের জায়গাটা ধরে রাখাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ভবিষ্যতে বাংলা গানের পাশাপাশি অভিনয়েও তাঁকে আরও দেখা যাবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ‘কাতুকুতু বুড়ো’ দিয়ে রাপূর্ণা ভট্টাচার্য যে তাঁর শিল্পীজীবনের নতুন দরজা খুলেছেন, সেটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

