উজান গাঙ্গুলি: অভিনয় থেকে পরিচালনায়, নিজের গল্প বলার পথে এক নতুন যাত্রা
বাংলা বিনোদন জগতে উজান গাঙ্গুলি নামটি খুব বেশি পুরনো নয়, কিন্তু এর মধ্যেই অভিনয়, লেখালেখি এবং পরিচালনার মতো একাধিক ক্ষেত্রে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলি এবং অভিনেত্রী চূর্ণী গাঙ্গুলির সন্তান হিসেবে খুব ছোট বয়স থেকেই সিনেমার পরিবেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। তবে পরিবারের পরিচিতিকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার বদলে নিজের আগ্রহ ও সৃজনশীলতার জায়গা তৈরি করার দিকেই বেশি মনোযোগী হয়েছেন উজান।
অভিনয় দিয়ে যাত্রার শুরু
উজান গাঙ্গুলির বড় পর্দায় অভিষেক হয় ২০১৮ সালের বাংলা সিনেমা ‘রসগোল্লা’-র মাধ্যমে। পাভেল পরিচালিত এই সিনেমায় তিনি রসগোল্লার স্রষ্টা নবীনচন্দ্র দাসের চরিত্রে অভিনয় করেন। প্রথম সিনেমাতেই ঐতিহাসিক একটি চরিত্রকে পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ পান তিনি, আর সেই কাজের মাধ্যমে দর্শকদের নজরেও আসেন।
এরপর ২০২২ সালে কৌশিক গাঙ্গুলি পরিচালিত ‘লক্ষ্মী ছেলে’ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন উজান। সেখানে তাঁকে আমির হুসেন নামে এক তরুণ চিকিৎসকের চরিত্রে দেখা যায়। এই সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক বিষয়ভিত্তিক গল্পের সঙ্গেও তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়।
অভিনয়ের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও সাফল্য
উজানের গল্পের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, অভিনয়ের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে World Literatures নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। অক্সফোর্ডে পড়াশোনার জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ Ertegun Scholarship-ও পেয়েছিলেন।
একসময় তাঁর সামনে দুটি আলাদা পথ ছিল—একদিকে গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক জীবন, অন্যদিকে সিনেমা ও গল্প বলার জগৎ। ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে উজান জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবা-মায়েরও এ বিষয়ে ভিন্ন মত ছিল; বাবা কৌশিক গাঙ্গুলি চাইতেন তিনি সিনেমার জগতেই থাকুন, অন্যদিকে মা চূর্ণী গাঙ্গুলি তাঁকে গবেষণার দিকে যেতে উৎসাহিত করতেন।
এবার ক্যামেরার পেছনে উজান
অভিনয়ের পর ধীরে ধীরে উজানের আগ্রহ আরও গভীরভাবে গল্প লেখা ও পরিচালনার দিকে চলে যায়। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘কুরুক্ষেত্র: দ্য গ্রেট ওয়ার অব মহাভারত’। মহাভারতের গল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি এই অ্যানিমেটেড সিরিজে উজান লেখক ও পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। সিরিজটি ২০২৫ সালে Netflix-এ মুক্তি পায়।
অ্যানিমেশনের মতো বড় পরিসরের একটি কাজ পরিচালনা করার পর উজান এবার লাইভ-অ্যাকশন সিনেমার পরিচালনাতেও পা রেখেছেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘কাতুকুতু বুড়ো’। ২০২৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে তাঁর নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
‘কাতুকুতু বুড়ো’ কেন গুরুত্বপূর্ণ
‘কাতুকুতু বুড়ো’ শুধু উজানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য পরিচালিত সিনেমা নয়, এটি তাঁর নিজের গল্প বলার ক্ষমতা ও পরিচালনাশৈলী দর্শকদের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এর আগে অভিনয়শিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও এবার তিনি ক্যামেরার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে একটি সম্পূর্ণ গল্পকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন।
উজানের নিজের কথাতেও গল্প বলার প্রতি তাঁর গভীর টান স্পষ্ট। ২০২৬ সালে সিনেমাটির মুক্তির আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া গল্প বলার প্রবণতাই জয়ী হয়েছে।
সামনে উজানের পথ কতটা আলাদা হতে পারে?
উজান গাঙ্গুলির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় সম্ভবত তাঁর বহুমুখী আগ্রহ। তিনি একইসঙ্গে অভিনেতা, লেখক, পরিচালক এবং সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত একজন শিল্পী। অভিনয়ের মাধ্যমে সামনে আসার পর লেখালেখি এবং অ্যানিমেশন পরিচালনা, এরপর পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা পরিচালনা—তাঁর যাত্রাটি বেশ বৈচিত্র্যময়।
পরিবারের সিনেমার পরিবেশ তাঁকে অবশ্যই ছোটবেলা থেকে একটি আলাদা অভিজ্ঞতা দিয়েছে। কিন্তু তাঁর নিজের পড়াশোনা, গল্প লেখার প্রতি আগ্রহ এবং পরিচালনায় কাজ করার ইচ্ছা দেখায় যে তিনি শুধু পারিবারিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে থাকতে চান না। বরং নিজের মতো করে গল্প বলার একটি জায়গা তৈরি করতেই তাঁর আগ্রহ বেশি।
ভবিষ্যতে উজান গাঙ্গুলি অভিনয়ের পাশাপাশি আরও কতগুলো গল্প লিখবেন বা পরিচালনা করবেন, সেটি সময়ই বলবে। তবে ইতিমধ্যেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করার পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনেও নিজের ভাবনা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তাঁর যথেষ্ট গভীর। আর সেই কারণেই বাংলা বিনোদন জগতে উজানের পরবর্তী কাজগুলোর দিকে দর্শকদের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক।

