বেনিসিও দেল তোরো: হলিউডের পর্দায় নিজের আলাদা পরিচয় গড়া এক অভিনেতার গল্প
হলিউডে এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাঁদের পর্দায় দেখলে আলাদা করে নাম বলার প্রয়োজন পড়ে না। তাঁদের অভিনয়ের ধরন, চোখের অভিব্যক্তি কিংবা সংলাপ বলার ভঙ্গিই দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। বেনিসিও দেল তোরো তেমনই একজন অভিনেতা। কখনো অপরাধজগতের রহস্যময় মানুষ, কখনো ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়া কোনো চরিত্র, আবার কখনো ভয়ংকর ঠান্ডা মাথার এক পেশাদার খুনি—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন।
অনেক অভিনেতাই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেন। কিন্তু সবার অভিনয় দর্শকের মনে সমানভাবে দাগ কাটে না। বেনিসিও দেল তোরোর বিশেষত্ব হলো, তিনি পর্দায় অল্প সময়ের জন্য এলেও নিজের উপস্থিতি অনুভব করাতে পারেন। তাঁর অভিনয়ে অতিরিক্ত নাটকীয়তার চেয়ে সংযম, নীরবতা এবং চরিত্রের ভেতরের জটিলতা বেশি গুরুত্ব পায়। Traffic, The Usual Suspects এবং Sicario–এর মতো কাজের মধ্য দিয়ে সেই দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।
বেনিসিও দেল তোরোর জন্ম ও শৈশব
বেনিসিও দেল তোরোর পুরো নাম বেনিসিও মনসেরাতে রাফায়েল দেল তোরো সানচেজ। তিনি ১৯৬৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পুয়ের্তো রিকোর সান জার্মান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পুয়ের্তো রিকোতে জন্ম হলেও তাঁর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায়। ছোটবেলার অভিজ্ঞতা এবং দুই ভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় তাঁর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর পরিবারে অভিনয় ছিল না প্রধান পেশা। পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান দিয়েগোতে ভর্তি হন। শুরুতে তাঁর পড়াশোনার বিষয় ছিল ব্যবসা। কিন্তু কলেজে একটি অভিনয়ের ক্লাস করার পর এই শিল্পের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। যে বিষয়টি শুরুতে পড়াশোনার পাশাপাশি করা একটি সাধারণ কাজ ছিল, ধীরে ধীরে সেটিই তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য সহজ কোনো পথ তৈরি করেনি। এই পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে হলে প্রয়োজন ছিল প্রশিক্ষণ, ধৈর্য এবং নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার সুযোগ। সেই লক্ষ্যেই তিনি নিউইয়র্কে গিয়ে অভিনয়ের ওপর আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেন। তিনি স্টেলা অ্যাডলার কনজারভেটরিতেও পড়াশোনা করেন, যেখানে অভিনয়ের কৌশল ও চরিত্র নির্মাণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
অভিনয়জগতে যাত্রার শুরু
বেনিসিও দেল তোরোর অভিনয়জীবনের শুরুটা খুব একটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে তিনি টেলিভিশনে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। সে সময় তাঁর সামনে বড় তারকা হয়ে ওঠার মতো কোনো নিশ্চিত পথ ছিল না। অন্য অনেক অভিনেতার মতো তাঁকেও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে এবং ছোট চরিত্রের মধ্য দিয়েই নিজের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ খুঁজতে হয়েছে।
১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া Big Top Pee-wee সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৮৯ সালে জেমস বন্ড সিরিজের Licence to Kill সিনেমায় তিনি ড্যারিও নামের এক খলচরিত্রে অভিনয় করেন। তুলনামূলক কম বয়সেই এমন একটি জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে কাজ করার সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে শুরুতেই তিনি রাতারাতি বড় তারকা হয়ে যাননি। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে বিভিন্ন সিনেমায় ছোট ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই সময়ের কাজগুলো তাঁকে পর্দায় নিজের উপস্থিতি ধরে রাখার কৌশল শিখতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনয়ের যে স্বতন্ত্র ধরন দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই শুরুর দিনগুলোতেই।
The Usual Suspects যেভাবে বদলে দেয় তাঁর ক্যারিয়ার
১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া The Usual Suspects বেনিসিও দেল তোরোর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা। ব্রায়ান সিঙ্গার পরিচালিত এই অপরাধধর্মী থ্রিলারে তিনি ফ্রেড ফেনস্টার নামের একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রটি খুব বেশি সময় পর্দায় না থাকলেও তাঁর অভিনয়ের ধরন দর্শকের নজর কাড়ে।
ফ্রেড ফেনস্টারের কথা বলার অদ্ভুত ভঙ্গি, শরীরী ভাষা এবং রহস্যময় উপস্থিতি চরিত্রটিকে আলাদা করে তুলেছিল। দেল তোরো চরিত্রটিকে কেবল সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপন করেননি; তাঁর হাঁটাচলা ও আচরণেও চরিত্রটির স্বভাব ফুটে উঠেছিল। ফলে সিনেমাটিতে তাঁর উপস্থিতি তুলনামূলক ছোট হলেও দর্শক ও সমালোচকদের কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকেন।
এই সিনেমার জন্য তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট স্পিরিট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। পরের বছর Basquiat সিনেমায় অভিনয়ের জন্যও একই পুরস্কার পান। পরপর দুটি কাজের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দেন, প্রচলিত নায়কোচিত চরিত্রের বাইরে গিয়েও অভিনয়ের শক্তি দিয়ে দর্শককে আকৃষ্ট করা সম্ভব।
Traffic: যে সিনেমা তাঁকে অস্কার এনে দেয়
বেনিসিও দেল তোরোর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া Traffic সিনেমার মাধ্যমে। স্টিভেন সোডারবার্গ পরিচালিত এই সিনেমায় মাদক ব্যবসা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মানুষের জীবন তুলে ধরা হয়েছে।
সিনেমাটিতে দেল তোরো জাভিয়ের রদ্রিগেজ নামের একজন মেক্সিকান পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রটি এমন একজন মানুষের, যিনি নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক জটিল ও দুর্নীতিগ্রস্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তাঁর অভিনয়ে দায়িত্ববোধ, অসহায়ত্ব এবং নৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো স্বাভাবিকভাবে ফুটে ওঠে।
এই চরিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অভিনয়ের সংযম। দেল তোরো অযথা আবেগ প্রকাশ করে চরিত্রটিকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেননি। বরং পরিস্থিতির চাপ, চোখের অভিব্যক্তি এবং স্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে চরিত্রটির ভেতরের সংগ্রাম তুলে ধরেছেন। তাঁর এই অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়।
২০০১ সালে Traffic সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার জেতেন। একই কাজের জন্য গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা পুরস্কারও অর্জন করেন। এই সাফল্যের পর হলিউডে তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি আর শুধু সম্ভাবনাময় একজন অভিনেতা ছিলেন না; বরং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্মাতাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।
21 Grams ও অভিনয়ের আরেকটি কঠিন অধ্যায়
Traffic–এর সাফল্যের পর বেনিসিও দেল তোরো এমন কিছু চরিত্র বেছে নেন, যেগুলোতে অভিনয়ের জন্য মানসিক জটিলতা বোঝা জরুরি ছিল। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ 21 Grams, যা ২০০৩ সালে মুক্তি পায়। আলেহান্দ্রো গনসালেস ইনারিতু পরিচালিত এই সিনেমায় তিনি জ্যাক জর্ডান নামের এক ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেন।
জ্যাক এমন একজন মানুষ, যার জীবনে অপরাধবোধ, অনুশোচনা এবং বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব একসঙ্গে কাজ করে। চরিত্রটির আচরণ সব সময় সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। কখনো তাকে দুর্বল মনে হয়, আবার কখনো তার সিদ্ধান্ত দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে। দেল তোরো চরিত্রটির এই অসংগতিপূর্ণ দিকগুলোকে অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন।
এই সিনেমায় তাঁর অভিনয় তাঁকে আবারও অস্কারের সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগের মনোনয়ন এনে দেয়। 21 Grams প্রমাণ করে, Traffic–এর সাফল্য কেবল একটি ভালো চরিত্রের ফল ছিল না; জটিল চরিত্রে অভিনয় করার মতো দক্ষতাও তাঁর রয়েছে।
Snatch, Fear and Loathing in Las Vegas ও Sin City
বেনিসিও দেল তোরোর অভিনয়জীবনের একটি মজার দিক হলো, তিনি একই ধরনের চরিত্রে নিজেকে আটকে রাখেননি। গম্ভীর অপরাধমূলক গল্প থেকে শুরু করে অদ্ভুত রসবোধে ভরা সিনেমা—বিভিন্ন ঘরানায় তিনি কাজ করেছেন।
১৯৯৮ সালের Fear and Loathing in Las Vegas সিনেমায় তিনি ড. গনজো চরিত্রে অভিনয় করেন। জনি ডেপের সঙ্গে তাঁর অভিনয় সিনেমাটিকে আরও অদ্ভুত ও বিশৃঙ্খল আবহ দেয়। এখানে তাঁকে Traffic–এর সংযত পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রের সঙ্গে মেলানো কঠিন। এই পার্থক্যই তাঁর অভিনয়ের ব্যাপ্তি বুঝতে সাহায্য করে।
২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া Snatch সিনেমায় তিনি ফ্র্যাঙ্কি ফোর ফিঙ্গার্স চরিত্রে অভিনয় করেন। গাই রিচি পরিচালিত এই অপরাধ-কমেডিতে একাধিক চরিত্রের গল্প একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। দেল তোরোর চরিত্রটি সেই জটিল পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে, ২০০৫ সালের Sin City সিনেমায় তিনি জ্যাকি বয় নামের এক হিংস্র ও আত্মকেন্দ্রিক চরিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমাটির দৃশ্যায়ন ও ভিজ্যুয়াল স্টাইল ছিল প্রচলিত হলিউড সিনেমার চেয়ে আলাদা। সেই পরিবেশে দেল তোরোর অভিনয় চরিত্রটির অস্বস্তিকর উপস্থিতিকে আরও জোরালো করে তোলে।
Che Guevara চরিত্রে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন
২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া Che সিনেমায় বেনিসিও দেল তোরো অভিনয় করেন কিউবার বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার চরিত্রে। স্টিভেন সোডারবার্গ পরিচালিত এই দুই পর্বের সিনেমায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বটির জীবন ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়।
চে গুয়েভারার মতো পরিচিত একটি ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয় করা সহজ ছিল না। এখানে শুধু বাহ্যিক চেহারার মিল থাকলেই চলে না; চরিত্রটির ব্যক্তিত্ব, আচরণ এবং রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা দিকও বুঝতে হয়। দেল তোরো এই চরিত্রের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রস্তুতি নেন এবং নিজের অভিনয়ে সেই প্রচেষ্টার ছাপ রাখেন।
সিনেমাটিতে তাঁর অভিনয় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। ২০০৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতেন। একই চরিত্রের জন্য ২০০৯ সালে গোয়া পুরস্কারেও সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পান।
এই কাজটি তাঁর ক্যারিয়ারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, Traffic ও 21 Grams–এর মতো সিনেমায় তিনি মূলত পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছিলেন। কিন্তু Che–তে তিনি একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমার প্রধান চরিত্রে নিজের অভিনয়ক্ষমতা তুলে ধরেন।
Sicario: আলেহান্দ্রো চরিত্রে অন্য এক বেনিসিও দেল তোরো
বেনিসিও দেল তোরোর জনপ্রিয় কাজগুলোর তালিকায় Sicario বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডেনি ভিলনভ পরিচালিত এই অপরাধ-থ্রিলারটি ২০১৫ সালে মুক্তি পায়। সিনেমাটিতে মাদক কার্টেলবিরোধী অভিযানের আড়ালে থাকা ক্ষমতা, সহিংসতা এবং নৈতিক জটিলতার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে দেল তোরো অভিনয় করেন আলেহান্দ্রো গিলিকের চরিত্রে। প্রথম দেখায় তাকে একজন দক্ষ ও ঠান্ডা মাথার অপারেটিভ মনে হলেও, গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্রের পেছনে থাকা উদ্দেশ্য ও অতীতের কিছু দিক সামনে আসে। তবে চরিত্রটির সবকিছু সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, আর এই রহস্যময়তাই তার আকর্ষণের বড় অংশ।
দেল তোরো এই চরিত্রে অভিনয়ের সময় খুব বেশি কথা বা অঙ্গভঙ্গির আশ্রয় নেননি। তাঁর চোখের দৃষ্টি, মুখের অভিব্যক্তি এবং শান্ত আচরণই অনেক সময় চরিত্রটির মনের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি এমন এক চাপ তৈরি করে, যা সিনেমাটির টানটান পরিবেশের সঙ্গে মানানসই।
Traffic–এর পর এই সিনেমা আবারও প্রমাণ করে, অপরাধ ও নৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে থাকা চরিত্রে বেনিসিও দেল তোরো বিশেষভাবে দক্ষ। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া Sicario: Day of the Soldado সিনেমায় তিনি আবারও আলেহান্দ্রো চরিত্রে ফিরে আসেন। প্রথম সিনেমায় তৈরি হওয়া চরিত্রটির জটিলতা এই সিক্যুয়েলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
Marvel ও Star Wars–এর মতো বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে
বেনিসিও দেল তোরোকে শুধু গম্ভীর বা বাস্তবধর্মী সিনেমায় সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। তিনি জনপ্রিয় বাণিজ্যিক সিনেমা এবং বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিতেও অভিনয় করেছেন।
২০১৪ সালের Guardians of the Galaxy সিনেমায় তিনি দ্য কালেক্টর চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রটি প্রচলিত নায়কের মতো নয়; বরং রহস্যময় এক সংগ্রাহক, যার আগ্রহ মহাবিশ্বের বিচিত্র ও মূল্যবান বস্তু নিয়ে। পরবর্তী সময়ে Avengers: Infinity War সিনেমাতেও তিনি একই চরিত্রে ফিরে আসেন।
২০১৭ সালের Star Wars: The Last Jedi সিনেমায় তিনি ডিজে নামের একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চরিত্রটি প্রচলিত নায়ক বা খলনায়কের ধারণার মধ্যে পুরোপুরি পড়ে না। তার নিজের স্বার্থ, সুবিধাবাদী মনোভাব এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা চরিত্রটিকে আলাদা করে তোলে।
এই কাজগুলো দেখায়, দেল তোরো বড় বাজেটের অ্যাকশন বা সায়েন্স ফিকশন সিনেমাতেও নিজের অভিনয়ের ধরন বজায় রাখতে পারেন। তিনি যে ধরনের চরিত্রই পান না কেন, সেটিকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।
টেলিভিশনেও অভিনয়ের দক্ষতার প্রমাণ
দেল তোরোর উল্লেখযোগ্য কাজ শুধু বড় পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৮ সালের টেলিভিশন মিনিসিরিজ Escape at Dannemora–তে তিনি রিচার্ড ম্যাট চরিত্রে অভিনয় করেন। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই বন্দির গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
রিচার্ড ম্যাট চরিত্রটি ছিল জটিল এবং নানা দিক থেকে অস্বস্তিকর। দেল তোরো চরিত্রটির আচরণ ও মানসিকতার বিভিন্ন দিক ফুটিয়ে তোলেন। এই অভিনয়ের জন্য তিনি ২০১৯ সালের প্রাইমটাইম এমি অ্যাওয়ার্ডসে সীমিত ধারাবাহিক বা টেলিভিশন সিনেমায় প্রধান অভিনেতা বিভাগে মনোনয়ন পান।
এই কাজের মাধ্যমে বোঝা যায়, দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রে অভিনয় করার পরও তিনি টেলিভিশনের গল্প বলার ধরনে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম। চরিত্রের গভীরতা ও গল্পের বাস্তবতা তাঁর অভিনয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
The French Dispatch ও The Phoenician Scheme
পরিচালক ওয়েস অ্যান্ডারসনের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমেও দেল তোরো নিজের অভিনয়ের অন্য একটি দিক দেখিয়েছেন। ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া The French Dispatch সিনেমায় তিনি মোজেস রোজেনথালার নামের এক শিল্পীর চরিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমাটির গল্প বলার ধরন, দৃশ্যের বিন্যাস এবং চরিত্র নির্মাণ প্রচলিত হলিউড সিনেমার চেয়ে বেশ আলাদা।
২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া The Phoenician Scheme সিনেমায় তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। এখানে তাঁর চরিত্রের নাম জা-জা কর্ডা, একজন ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। গল্পে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সম্পদ এবং নানা বিপজ্জনক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই সিনেমাগুলো তাঁর ক্যারিয়ারের বৈচিত্র্য বোঝার জন্য উল্লেখযোগ্য। একদিকে তিনি Sicario–এর মতো কঠিন ও বাস্তবধর্মী থ্রিলারে অভিনয় করেছেন, অন্যদিকে ওয়েস অ্যান্ডারসনের স্বতন্ত্র ভঙ্গির সিনেমাতেও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। একই অভিনেতার কাছ থেকে এমন ভিন্নধর্মী অভিনয় পাওয়া তাঁর দক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বেনিসিও দেল তোরোর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও মনোনয়ন এসেছে। তাঁর অর্জনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো Traffic সিনেমার জন্য পাওয়া অস্কার। একই সিনেমার জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা এবং স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড পুরস্কারও অর্জন করেন।
The Usual Suspects ও Basquiat–এর জন্য পাওয়া ইন্ডিপেনডেন্ট স্পিরিট অ্যাওয়ার্ড তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। অন্যদিকে 21 Grams তাঁকে দ্বিতীয়বারের মতো সেরা পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে অস্কারের মনোনয়ন এনে দেয়।
Che সিনেমার জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাওয়া তাঁর অভিনয়জীবনের আরেকটি বড় সাফল্য। একই কাজের জন্য গোয়া পুরস্কার অর্জনও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
তাঁর পুরস্কারগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—দেল তোরোর সাফল্য কেবল জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া স্বাধীন ধারার কাজ থেকে শুরু করে বড় বাজেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি, বিভিন্ন ধরনের প্রযোজনায় তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।
বেনিসিও দেল তোরোর অভিনয়ের বিশেষত্ব কোথায়?
বেনিসিও দেল তোরোর অভিনয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর সংযম। অনেক সময় একটি চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য দীর্ঘ সংলাপ বা অতিরিক্ত আবেগের প্রয়োজন হয় না। দেল তোরো সেই বিষয়টি ভালোভাবে বোঝেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি, থেমে থেমে কথা বলা কিংবা নীরব থাকার মধ্য দিয়েও চরিত্রের মানসিক অবস্থা বোঝা যায়।
তাঁর কণ্ঠস্বর ও শারীরিক উপস্থিতিও অভিনয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে শুধু গম্ভীর কণ্ঠ বা রহস্যময় চেহারার কারণে তিনি আলাদা নন। একই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তিনি চরিত্রভেদে অভিনয়ের ধরন বদলাতে পারেন। Traffic–এর জাভিয়ের রদ্রিগেজ, 21 Grams–এর জ্যাক জর্ডান এবং Sicario–এর আলেহান্দ্রো গিলিক—তিনটি চরিত্রের মানসিক জগৎ একে অপরের থেকে আলাদা।
আরেকটি বিষয় হলো, তিনি সব সময় প্রচলিত নায়কের ভূমিকা খোঁজেন না। অনেক চরিত্রের মধ্যে নৈতিক দ্বন্দ্ব, দুর্বলতা কিংবা অস্বস্তিকর দিক থাকে। দেল তোরো এসব বৈশিষ্ট্য আড়াল না করে বরং চরিত্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে তাঁর অভিনীত মানুষগুলোকে কখনো সহজে ভালো বা খারাপ বলে চিহ্নিত করা যায় না।
ব্যক্তিগত জীবন ও কাজের বাইরে বেনিসিও দেল তোরো
বেনিসিও দেল তোরো সাধারণত নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখেন না। তাঁর পরিচিতি মূলত অভিনয় ও চলচ্চিত্রের কাজকে ঘিরেই। তাই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবন নিয়ে অনুমাননির্ভর আলোচনা না করে তাঁর পেশাগত অর্জনের দিকে মনোযোগ দেওয়াই বেশি যুক্তিসংগত।
অভিনেতা হিসেবে তাঁর দীর্ঘ পথচলা থেকে একটি বিষয় বোঝা যায়—ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সব সময় প্রচলিত তারকাসুলভ ইমেজের ওপর নির্ভর করতে হয় না। ভালো চরিত্র নির্বাচন, অভিনয়ের প্রতি মনোযোগ এবং ভিন্ন ধরনের কাজের প্রতি আগ্রহ একজন শিল্পীকে দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক রাখতে পারে।
দেল তোরোর ক্যারিয়ারে এমন অনেক সিনেমা রয়েছে, যেখানে তাঁর অভিনয় পুরো গল্পের আবহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কখনো তিনি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, আবার কখনো পার্শ্বচরিত্র হয়েও দর্শকের মনে থেকে গেছেন। তাঁর কাজের এই বৈচিত্র্যই তাঁকে অন্য অনেক অভিনেতার থেকে আলাদা করে।
শেষ কথা
বেনিসিও দেল তোরোর ক্যারিয়ার দেখলে বোঝা যায়, একজন অভিনেতার সাফল্য শুধু প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা কিংবা পর্দায় বেশি সময় থাকার ওপর নির্ভর করে না। কখনো একটি স্মরণীয় পার্শ্বচরিত্রও একজন শিল্পীর পরিচয় বদলে দিতে পারে। The Usual Suspects তাঁকে আলোচনায় এনেছিল, Traffic এনে দিয়েছিল অস্কার, আর Sicario–এর আলেহান্দ্রো গিলিক চরিত্র তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও বিশেষভাবে পরিচিত করেছে।
তাঁর অভিনয়ের মধ্যে এমন এক ধরনের স্বাভাবিকতা রয়েছে, যা চরিত্রকে কৃত্রিম মনে হতে দেয় না। তিনি সব সময় দর্শককে মুগ্ধ করার জন্য অভিনয় করেন—এমন মনে হয় না; বরং চরিত্রটি কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে চলে, সেটিই তাঁর অভিনয়ে গুরুত্ব পায়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে বেনিসিও দেল তোরো প্রমাণ করেছেন, নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেও একজন অভিনেতা বিভিন্ন ঘরানার সিনেমায় সফল হতে পারেন। তাঁর কাজের দিকে ফিরে তাকালে শুধু একজন পুরস্কারজয়ী অভিনেতার গল্প নয়, বরং অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করা একজন শিল্পীর দীর্ঘ যাত্রাও দেখা যায়।

