Priyanka Sarkar: From Early Television Days to Lasting Recognition

Priyanka Sarkar Bengali actress in a portrait
Priyanka Sarkar at a public appearance as a Bengali actress
প্রিয়াঙ্কা সরকার: জীবনী, অভিনয়জীবন, জনপ্রিয় সিনেমা ও ব্যক্তিগত জীবন

বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কিছু অভিনেত্রী রয়েছেন, যাঁরা শুধু সৌন্দর্য কিংবা জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে নিজেদের জায়গা তৈরি করেননি; বরং অভিনয়ের বৈচিত্র্য দিয়ে দর্শকের মনে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন। প্রিয়াঙ্কা সরকার তাঁদেরই একজন। কখনও প্রেমের গল্পে, কখনও রহস্যনির্ভর ছবিতে, আবার কখনও সমাজের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

টেলিভিশনের মাধ্যমে খুব অল্প বয়সে অভিনয়জগতে পা রেখেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। এরপর বড় পর্দায় এসে এমন কিছু ছবিতে অভিনয় করেন, যেগুলো তাঁকে বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে পরিচিত করে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাজের পরিধি বেড়েছে। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওয়েব সিরিজেও অভিনয় করেছেন তিনি। বিশেষ করে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘রাজকাহিনী’, ‘ক্রিসক্রস’, ‘আন্দরকাহিনী’ এবং ‘বিবাহ অভিযান’-এর মতো কাজ তাঁর অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ।

তবে প্রিয়াঙ্কার পথচলা শুধু সফল সিনেমার তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিনোদনজগতে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ার বাংলা বিনোদনজগতের একজন অভিনেত্রীর দীর্ঘ পথচলার গল্প।

প্রিয়াঙ্কা সরকারের জন্ম ও পরিচয়

প্রিয়াঙ্কা সরকার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মতারিখ ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯০ বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তিনি মূলত বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত।

ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল। অন্য অনেক অভিনেত্রীর মতো পড়াশোনা শেষ করে অভিনয়ে আসেননি তিনি; বরং অল্প বয়সেই টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। ফলে অভিনয়, শুটিং এবং বিনোদনজগতের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা তৈরি হতে থাকে কৈশোরেই।

প্রিয়াঙ্কার ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি সময়ের সঙ্গে নিজের কাজের ধরন পরিবর্তন করেছেন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বাণিজ্যিক বাংলা ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পেলেও পরবর্তী সময়ে ভিন্নধর্মী গল্প ও চরিত্রেও কাজ করেছেন। এই পরিবর্তন তাঁর অভিনয়জীবনকে আরও বিস্তৃত করেছে।

ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের শুরু

প্রিয়াঙ্কা সরকারের অভিনয়জীবনের শুরু হয়েছিল টেলিভিশনের মাধ্যমে। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। ২০২৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, শৈশবেই বিনোদনজগতে প্রবেশের পর প্রায় পাঁচ বছর ধরে টেলিফিল্ম, মিউজিক ভিডিও, স্বল্পদৈর্ঘ্যের কাজ এবং সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানের মতো বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ ছোট বয়সে নিয়মিত শুটিংয়ে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক থাকা, সংলাপ বলা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার মতো বিষয়গুলো শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

অভিনয়জগতে দীর্ঘদিন টিকে থাকার জন্য প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। প্রিয়াঙ্কার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা তাঁকে এসব বিষয়ে বাস্তব শিক্ষা দিয়েছে।

শৈশব থেকেই কাজ করার কারণে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত আগ্রহের মধ্যে ভারসাম্য রাখাও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি শখ ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ দেওয়ার গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেছেন।

চলচ্চিত্রে অভিষেক ও ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’

প্রিয়াঙ্কা সরকারের চলচ্চিত্রজীবনের শুরুর দিকের একটি কাজ হলো ২০০৫ সালের ‘দাদার আদেশ’। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মোড় আসে ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির মাধ্যমে।

রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত এই ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকার ও রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটির প্রেমের গল্প, আবেগঘন উপস্থাপনা এবং দুই অভিনয়শিল্পীর পর্দার রসায়ন দর্শকের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ প্রিয়াঙ্কার পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ছবির পর দর্শক তাঁকে নতুনভাবে চিনতে শুরু করেন। নির্মাতাদের কাছেও তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

ছবিটির সাফল্যের আরেকটি দিক ছিল প্রিয়াঙ্কা ও রাহুলের পর্দার জুটি। পরবর্তী সময়ে তাঁরা একসঙ্গে একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। তাঁদের একসঙ্গে কাজ করার ধারাবাহিকতা বাংলা সিনেমার দর্শকদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছিল।

রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পর্দার জুটি

প্রিয়াঙ্কা সরকারের অভিনয়জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কাজের প্রসঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই আসে। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর পর তাঁরা ‘বিবাহ অভিযান’, ‘লাভ সার্কাস’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ এবং আরও কয়েকটি ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন।

তাঁদের জুটির জনপ্রিয়তার পেছনে ছিল পরিচিত আবেগঘন অভিনয় এবং পর্দায় স্বাভাবিক উপস্থিতি। বিশেষ করে প্রেম ও সম্পর্কের গল্পে তাঁদের অভিনয় দর্শকের সঙ্গে সহজে সংযোগ তৈরি করতে পেরেছিল।

তবে প্রিয়াঙ্কার ক্যারিয়ার শুধু এই জুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি অন্য অভিনেতা ও পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এর ফলে তাঁর অভিনয়ের পরিসর ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে।

একজন অভিনেত্রীর দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারে একই ধরনের পরিচিতির বাইরে বেরিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয়াঙ্কার পরবর্তী কাজগুলোতে সেই পরিবর্তনের চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘রাজকাহিনী’ ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি

২০১৫ সালে সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘রাজকাহিনী’ মুক্তি পায়। দেশভাগের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই ছবিতে একটি পতিতালয়ের নারীদের জীবন, সংগ্রাম এবং সামাজিক বাস্তবতার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটিতে প্রিয়াঙ্কা সরকারও অভিনয় করেন।

‘রাজকাহিনী’ বাংলা চলচ্চিত্রের আলোচিত কাজগুলোর একটি। এর গল্পে নারীজীবন, সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে এসেছে।

এ ধরনের ছবিতে অভিনয়ের জন্য শুধু সংলাপ বলা যথেষ্ট নয়। চরিত্রের পরিস্থিতি, তার মানসিক অবস্থান এবং গল্পের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বুঝে অভিনয় করতে হয়। প্রিয়াঙ্কার ক্যারিয়ারে ‘রাজকাহিনী’ এমন একটি কাজ, যা তাঁর বাণিজ্যিক ছবির পরিচিতির বাইরে অন্য ধরনের গল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার দিকটি সামনে নিয়ে আসে।

‘ব্যোমকেশ’, ‘জোকার ধন’ ও অন্যান্য সিনেমা

প্রিয়াঙ্কা সরকার বিভিন্ন ধরনের গল্পে অভিনয় করেছেন। গোয়েন্দা কাহিনি, রহস্য, সামাজিক নাটক এবং বাণিজ্যিক বিনোদন—বিভিন্ন ধারার ছবিতে তাঁকে দেখা গেছে।

২০১৫ সালের ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ ছবিতে তিনি ইন্দিরা চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর ২০১৬ সালে ‘ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা’ ছবিতেও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্রকে ঘিরে নির্মিত এই ছবিগুলো বাংলা সাহিত্যের পরিচিত গল্পকে পর্দায় তুলে ধরেছে।

২০১৭ সালের ‘জওকের ধন’ ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন। রহস্য ও অভিযাননির্ভর গল্পের এই ছবিতে তাঁর কাজ ছিল ক্যারিয়ারের ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।

এ ছাড়া ‘অ্যাবি সেন’, ‘দ্য রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’, ‘কাবির’, ‘আমার আপনজন’ এবং ‘ক্রিসক্রস’-এর মতো ছবিতেও তিনি অভিনয় করেছেন। প্রতিটি ছবির গল্প ও চরিত্র আলাদা হওয়ায় তাঁর অভিনয়ের ধরনেও বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

‘ক্রিসক্রস’ ও নারীজীবনের গল্প

২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ক্রিসক্রস’ প্রিয়াঙ্কা সরকারের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর একটি। বিরসা দাশগুপ্ত পরিচালিত এই ছবিতে কলকাতার কয়েকজন নারীর জীবন, সম্পর্ক, ব্যক্তিগত সংকট এবং নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকার লড়াই তুলে ধরা হয়েছে।

ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সুজি চরিত্রে অভিনয় করেন। গল্পটির অন্যতম দিক হলো, এখানে নারীদের জীবনকে শুধু পারিবারিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দেখানো হয়নি; বরং তাঁদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা, হতাশা, সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীনতার প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রিয়াঙ্কার ক্যারিয়ারে এ ধরনের ছবির গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এগুলো তাঁকে শুধু প্রচলিত প্রেমের গল্পের অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতাভিত্তিক গল্পের অংশ হিসেবেও তুলে ধরে।

নারীকেন্দ্রিক গল্পে অভিনয়ের ক্ষেত্রে চরিত্রের আবেগকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। ‘ক্রিসক্রস’-এর মতো ছবিতে বিভিন্ন নারীর অভিজ্ঞতা পাশাপাশি উঠে আসায় দর্শকও চরিত্রগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে সংযোগ তৈরি করার সুযোগ পান।

‘আন্দরকাহিনী’: অভিনয়জীবনের ভিন্নধর্মী কাজ

প্রিয়াঙ্কা সরকারের অভিনয়জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ‘আন্দরকাহিনী’। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল এবং ছবিটি তাঁকে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করার সুযোগ দেয়।

সাধারণ বাণিজ্যিক ছবির বাইরে গিয়ে এমন গল্পে অভিনয় করা একজন শিল্পীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। কারণ এসব কাজে প্রচলিত নায়ক-নায়িকাকেন্দ্রিক গল্পের চেয়ে চরিত্রের মানসিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত সংকটের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রিয়াঙ্কার ক্যারিয়ারে ‘আন্দরকাহিনী’ তাঁর অভিনয়ের অন্য একটি দিক তুলে ধরে। বিভিন্ন পুরস্কার ও চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে ছবিটির নাম যুক্ত হয়েছে বলে জীবনীমূলক সূত্রগুলোতে উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রতিটি পুরস্কারের নির্দিষ্ট বিভাগ ও সাল প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট আয়োজকের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

টেলিভিশন থেকে ওয়েব সিরিজে যাত্রা

টেলিভিশনে কাজ শুরু করলেও প্রিয়াঙ্কা সরকার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন মাধ্যমেও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিস্তার তাঁর মতো অভিজ্ঞ অভিনেত্রীদের জন্য নতুন ধরনের চরিত্রে কাজ করার সুযোগ তৈরি করেছে।

২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হ্যালো!’ ওয়েব সিরিজে তিনি অভিনয় করেন। এই সিরিজে তাঁর চরিত্রের নাম ছিল দেবলীনা সোম, যিনি নীনা নামেও পরিচিত। রহস্য, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা নিয়ে নির্মিত সিরিজটি বাংলা ওটিটির দর্শকদের মধ্যে পরিচিতি পায়।

পরবর্তী সময়ে ‘রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ’, ‘ছোটলোক’, ‘মহাভারত মার্ডার্স’ এবং ‘লজ্জা’র মতো ওয়েব সিরিজেও তাঁকে দেখা গেছে। এসব কাজের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও সক্রিয় থেকেছেন।

ওয়েব সিরিজের গল্প বলার ধরন সাধারণ চলচ্চিত্রের তুলনায় অনেক সময় আলাদা হয়। এখানে চরিত্রের বিকাশের জন্য বেশি সময় পাওয়া যায় এবং গল্পের বিভিন্ন স্তর ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে পারে। প্রিয়াঙ্কার মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অভিনেত্রীর জন্য এই মাধ্যম নতুন অভিনয়-সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে প্রিয়াঙ্কা সরকার

প্রিয়াঙ্কা সরকারের ক্যারিয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশেরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ‘হৃদয় জুড়ে’-এর মাধ্যমে ঢালিউডে তাঁর কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে একসময় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ছবিটিতে বাংলাদেশের অভিনেতা নিরবের সঙ্গে তাঁর অভিনয় করার কথা ছিল।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাজ করার বিষয়ে প্রিয়াঙ্কা আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। প্রথম আলো-এর ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তাঁর ঢালিউডে অভিষেকের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

দুই বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বাংলাদেশেও পরিচিতি পান। একইভাবে বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজও পশ্চিমবঙ্গের দর্শকদের কাছে আগ্রহ তৈরি করে। প্রিয়াঙ্কার বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা এই সাংস্কৃতিক সংযোগের একটি উদাহরণ।

তবে কোনো ছবির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা, শুটিং সম্পন্ন হওয়া এবং ছবিটি মুক্তি পাওয়া এক বিষয় নয়। তাই তাঁর বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে কাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া অতিরিক্ত দাবি করা ঠিক হবে না।

ব্যক্তিগত জীবন ও মাতৃত্ব

প্রিয়াঙ্কা সরকারের ব্যক্তিগত জীবনও বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ২০১০ সালে। তাঁদের একটি ছেলে রয়েছে, যার নাম সহজ বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রিয়াঙ্কা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ছেলের পড়াশোনা, শখ এবং বেড়ে ওঠা নিয়ে কথা বলেছেন। ২০২৪ সালে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি শিশুদের জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি শখ, বই পড়া এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।

ছেলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যেও বন্ধুত্বপূর্ণ বোঝাপড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, শিশুদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন, তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন দায়িত্বশীল হয় এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ কমিয়ে না দেয়।

অভিনয়জীবনের ব্যস্ততার পাশাপাশি সন্তানের দেখাশোনা ও বেড়ে ওঠার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে পেশাগত দায়িত্ব ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।

রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ও কঠিন সময়

২০২৬ সালের ২৯ মার্চ অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যু বাংলা বিনোদনজগতে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের তালসারিতে শুটিং চলাকালে সমুদ্রে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়।

রাহুলের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। তাঁদের বিয়ে, পরবর্তী সময়ে আলাদা থাকা এবং আবার একসঙ্গে জীবন শুরু করার খবর বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল। ২০২৬ সালের জুনে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা এই কঠিন সময়, ব্যক্তিগত শোক এবং নিজের জীবনকে নতুনভাবে সামলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন।

এ ধরনের ব্যক্তিগত ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল থাকা জরুরি। প্রিয়াঙ্কার অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অংশ, তাই তাঁর নিজের বক্তব্যের বাইরে গিয়ে আবেগ বা পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুমান করা উচিত নয়।

তবে তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে বোঝা যায়, দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং সহকর্মীদের সমর্থন কঠিন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও কাজের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা এবং সন্তানকে ঘিরে দায়িত্ব পালন করা তাঁর জীবনের বর্তমান অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

২০২৬ সালে প্রিয়াঙ্কা সরকারের সাম্প্রতিক কাজ

প্রিয়াঙ্কা সরকার এখনও অভিনয়ে সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কাজের মধ্যে ‘নধরের ভেলা’ এবং ‘মায়া সত্য ভ্রম’ উল্লেখযোগ্য।

‘নধরের ভেলা’ ছবিতে তাঁর অভিনয় নিয়ে প্রশংসা প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে Indulge Express-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা ছবিটির চিত্রনাট্য, চরিত্র নির্মাণ এবং শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছবিটির বিস্তারিত চিত্রনাট্য ও চরিত্রের পেছনের গল্প তাঁকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করেছে।

অন্যদিকে ‘মায়া সত্য ভ্রম’ একটি মনস্তাত্ত্বিক রহস্যধর্মী বাংলা চলচ্চিত্র, যেখানে প্রিয়াঙ্কা সরকার ও সোহম মজুমদার অভিনয় করেছেন। ছবিটির গল্পে একটি শিশুর নিখোঁজ হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে রহস্য, সত্য এবং মানুষের বিশ্বাসের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটি ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়।

সাম্প্রতিক এই কাজগুলো দেখায়, প্রিয়াঙ্কা এখনও নতুন ধরনের গল্প ও চরিত্রে কাজ করার আগ্রহ ধরে রেখেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরও অভিনয়ের নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা তাঁর কাজের ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

প্রিয়াঙ্কা সরকারের অভিনয়শৈলী

প্রিয়াঙ্কা সরকারের অভিনয়জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি একই ধরনের চরিত্রে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে প্রেমের গল্প ও বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিচিতি পেলেও পরে রহস্য, সামাজিক নাটক এবং নারীজীবনকেন্দ্রিক গল্পেও কাজ করেছেন।

তাঁর অভিনয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চরিত্রের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর মতো রোমান্টিক ছবির সঙ্গে ‘রাজকাহিনী’ বা ‘ক্রিসক্রস’-এর মতো ভিন্নধর্মী কাজের তুলনা করলে তাঁর ক্যারিয়ারের বৈচিত্র্য বোঝা যায়।

ওয়েব সিরিজে কাজ করার মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ পরিসরের গল্প বলার সুযোগও পেয়েছেন। ফলে চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল মাধ্যম—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে।

একজন অভিনেতার ক্যারিয়ারে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সময়ের সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতা গ্রহণ করাও জরুরি। প্রিয়াঙ্কার দীর্ঘ অভিনয়জীবন এই দুই দিকেরই পরিচয় বহন করে।

প্রিয়াঙ্কা সরকার কেন দর্শকের কাছে পরিচিত?

প্রিয়াঙ্কা সরকারের জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, খুব অল্প বয়সে অভিনয় শুরু করার কারণে বিনোদনজগতে তাঁর অভিজ্ঞতা দীর্ঘ। দ্বিতীয়ত, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর মতো জনপ্রিয় ছবির মাধ্যমে তিনি বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত হন। তৃতীয়ত, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের গল্পে কাজ করে নিজের অভিনয়ের পরিসর বাড়িয়েছেন।

এ ছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন ও ওয়েব সিরিজে কাজ করার ফলে বিভিন্ন বয়সের দর্শকের কাছে তাঁর উপস্থিতি পৌঁছেছে। তাঁর ক্যারিয়ার একই সঙ্গে বাণিজ্যিক বিনোদন এবং তুলনামূলকভাবে ভিন্নধর্মী গল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে গড়ে উঠেছে।

দর্শকের কাছে একজন অভিনেত্রীর পরিচিতি তৈরি হতে সময় লাগে। আবার সেই পরিচিতি ধরে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত কাজ এবং নতুন চরিত্রে অভিনয়ের সাহস। প্রিয়াঙ্কার দীর্ঘ পথচলায় এই দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শেষকথা

প্রিয়াঙ্কা সরকারের জীবন ও অভিনয়জীবন বাংলা বিনোদনজগতের একজন অভিনেত্রীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি। মাত্র ১২ বছর বয়সে টেলিভিশনে কাজ শুরু করে তিনি ধীরে ধীরে বড় পর্দায় নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ তাঁকে দর্শকের কাছে পরিচিত করে তুললেও ‘রাজকাহিনী’, ‘ক্রিসক্রস’, ‘আন্দরকাহিনী’ এবং বিভিন্ন ওয়েব সিরিজ তাঁর কাজের বৈচিত্র্যকে সামনে এনেছে।

ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু তাঁর জীবনে একটি কঠিন অধ্যায় তৈরি করেছে। তবু অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ধরে রেখে নতুন কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।

প্রিয়াঙ্কা সরকারের ক্যারিয়ারকে শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় ছবির তালিকা দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং নতুন ধরনের চরিত্র গ্রহণের প্রচেষ্টা তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত অভিনেত্রীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আগামী দিনে তাঁর অভিনয়জীবন কোন দিকে এগোয়, তা দেখার জন্য দর্শকদের আগ্রহ থাকবেই।

তথ্যসূত্র: