আজিজুল হাকিম: মঞ্চ থেকে টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা
বাংলাদেশের নাট্যজগতের এমন কিছু অভিনয়শিল্পী আছেন, যাদের পর্দায় দেখলেই আলাদা করে পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। আজিজুল হাকিম তেমনই একজন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—তিন মাধ্যমেই নিজের অভিনয়ের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন নাটকে তার উপস্থিতি দর্শকদের কাছে তাকে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলে।
অভিনয়ের শুরুটা যেভাবে
অভিনয়ের প্রতি আজিজুল হাকিমের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অভিনয় ও অন্যান্য পরিবেশনায় অংশ নিতেন তিনি। তবে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার পথটি তৈরি হয় মঞ্চের মাধ্যমে।
১৯৭৭ সালে তিনি আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন। মঞ্চে তার প্রথম অভিনীত নাটক ছিল ‘ওরা কদম আলী’। থিয়েটারের নিয়মিত চর্চা তাকে অভিনয়ের ভিত শক্ত করতে সাহায্য করে। পরবর্তীতে মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতাই তার টেলিভিশন অভিনয়ের পথকে আরও সমৃদ্ধ করে।
টেলিভিশনে পরিচিতি
১৯৮১ সালে ‘এখানে নোঙর’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে তার যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে ছোট ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে তিনি বড় চরিত্রে সুযোগ পেতে থাকেন। ১৯৮৪ সালে ‘তবুও তো সে’ নাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।
এরপর একের পর এক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে নিজের জায়গা তৈরি করেন আজিজুল হাকিম। নব্বইয়ের দশকে বিটিভির সাপ্তাহিক ও ধারাবাহিক নাটকে তার নিয়মিত উপস্থিতি তাকে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। **‘কোন কাননের ফুল’, ‘শিংসপ্তক’, ‘সময় অসময়’, ‘দিন রাত্রির খেলা’**সহ বিভিন্ন নাটকে তার অভিনয় দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়।
চলচ্চিত্রেও সফল উপস্থিতি
টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও কাজ করার স্বপ্ন ছিল আজিজুল হাকিমের। তার চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ‘শঙ্খনীল কারাগার’ দিয়ে। হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়ে। পরবর্তীতে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘জয়যাত্রা’, ‘গলুই’ এবং আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রে তার কাজের সংখ্যা হয়তো টেলিভিশনের তুলনায় কম, কিন্তু বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে চেনায়।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাও
আজিজুল হাকিম শুধু অভিনেতা হিসেবেই থেমে থাকেননি। নাট্য পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। আরণ্যক নাট্যদলের সঙ্গে কাজ করার সময় মঞ্চে ‘পাথর’ নাটক পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে টেলিভিশনেও পরিচালনার কাজ করেছেন। অভিনয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তার পরিচালনার ক্ষেত্রেও কাজে এসেছে।
ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নও ছিল
আজিজুল হাকিমের জীবনের একটি মজার দিক হলো, অভিনয়ে না এলে হয়তো তাকে আমরা একজন ফুটবলার হিসেবেই দেখতে পেতাম। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। স্কুল ও কলেজের হয়ে খেলার পাশাপাশি তিনি ঢাকার ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবলেও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। তার বাবা নিজেও চাইতেন ছেলে বড় ফুটবলার হোক।
অবশ্য শেষ পর্যন্ত ফুটবল মাঠের বদলে মঞ্চের আলোই তার জীবনের প্রধান ঠিকানা হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিজীবন
আজিজুল হাকিম ১৯৯৩ সালে নাট্যকার ও নির্দেশক জিনাত হাকিমকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। অভিনয়জীবনের পাশাপাশি পরিবারকেও তিনি বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন।
পাঁচ দশকের অভিনয়জীবন
২০২৬ সালে আজিজুল হাকিমের অভিনয়জীবন ৫০ বছরে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের বিনোদনজগতের অনেক পরিবর্তন তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। মঞ্চের সেই শুরুর দিন থেকে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তার সময়, এরপর চলচ্চিত্র ও নতুন প্রজন্মের নাটকের সময়—প্রতিটি পর্বেই তিনি নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন।
তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই—সময় বদলেছে, অভিনয়ের ধরন বদলেছে, দর্শকদের রুচিতেও পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু আজিজুল হাকিমের অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থেমে যায়নি। পাঁচ দশক পেরিয়েও তিনি এখনও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত, আর পর্দায় তার উপস্থিতি পুরোনো দর্শকদের যেমন নস্টালজিক করে, তেমনি নতুন দর্শকদের কাছেও তাকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশের অভিনয়জগতের দীর্ঘ পথচলায় আজিজুল হাকিম তাই শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার নাম নয়; তিনি এমন একজন শিল্পী, যার ক্যারিয়ারের সঙ্গে দেশের টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকের একটি বড় সময়ের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে।

